হবিগঞ্জ
ধর্মঘটে বাস বন্ধ, মহাসড়কে যাত্রী নামিয়ে হয়রানি

ছবি: আগামীর সময়
ধর্মঘট ঘোষণা দিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চলাচলকারী বাস থামিয়ে যাত্রী নামিয়ে দিচ্ছেন হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের শ্রমিকরা। এতে যাত্রাপথে আটকা পড়ে শিশুসহ হাজারো নারী-পুরুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
আজ বৃহস্পতিবার ভোর থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত জেলার শায়েস্তাগঞ্জ গোলচত্বরে এ পরিস্থিতি দেখা যায়।
মৌলভীবাজার জেলার ওপর দিয়ে সিলেটগামী রুটে হবিগঞ্জের বাস চলাচলে বাধার অভিযোগে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সপ্তম দফায় অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট করছে মোটর মালিক গ্রুপ। হবিগঞ্জ থেকে সিলেটের তিনটি রুটসহ মোট ১২টি রুটে ২৫০টি বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে স্থানীয় প্রায় ৭০ হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছেন।
এদিকে, ধর্মঘট শুরুর পর ভোর থেকেই শায়েস্তাগঞ্জ নতুনব্রিজ গোলচত্বরে অবস্থান নেন হবিগঞ্জের বাসশ্রমিকরা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন বাস থামিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। পণ্যবাহী যান চলাচল করতে দিলেও বাস আটকে দেওয়ায় সেগুলোও যানজটে আটকা পড়ে। মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় তিন কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়।
মামুন পরিবহনের বাসে তিন সন্তান নিয়ে ঢাকা থেকে সিলেট যাচ্ছিলেন ফরিদা ইয়াসমিন। শায়েস্তাগঞ্জে পৌঁছালে শ্রমিকরা বাসটি থামিয়ে চালক ও ৫০ যাত্রীকে নামিয়ে দেন। এ সময় ফরিদা ইয়াসমিন কারণ জানতে চাইলে শ্রমিকদের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। সেখানে আটকা পড়েছে অর্ধশতাধিক বাস।
এদিকে, বাস চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীরা ছোট যানবাহনে দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন হবিগঞ্জ–সিলেট বাইপাস, মাধবপুর–সিলেট বাইপাস এবং হবিগঞ্জ–শ্রীমঙ্গল–মৌলভীবাজার–সিলেট রুটের যাত্রীরা। জেলার নয়টি উপজেলা রুটেও বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।
হবিগঞ্জ–শ্রীমঙ্গল–মৌলভীবাজার–সিলেট রুটটি মৌলভীবাজার জেলার ওপর দিয়ে গেছে। গত বছর থেকে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের ১২৪টি বাসের অধিকাংশই ফিটনেসবিহীন—এ অভিযোগ তুলে সেগুলোর চলাচলে বাধা দিয়ে আসছেন মৌলভীবাজারের শ্রমিকরা।
এ নিয়ে গত ১১ মে শেরপুর এলাকায় দুই জেলার শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও বাস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে চার ঘণ্টা বন্ধ থাকে ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক। পরে ভাঙচুরের প্রতিবাদে ১৩ মে হবিগঞ্জ থেকে সিলেটের তিনটি রুটে ধর্মঘট ডাকে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপ। ১৫ মে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বৈঠকে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা হলেও সমাধান হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও মৌলভীবাজারে স্টপেজের সংখ্যা নিয়ে মতভেদের কারণে সমঝোতা হয়নি। হবিগঞ্জ পক্ষ তিনটি স্টপেজ চাইলেও মৌলভীবাজার পক্ষ দুটি স্টপেজে অনড় থাকে।
বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর আবারও গাড়ি চলাচলে বাধার অভিযোগ তুলে ১৬ মে শায়েস্তাগঞ্জে ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক দুই ঘণ্টা অবরোধ করেন হবিগঞ্জ বাসমালিক সমিতির নেতারা।পরে পুলিশ সুপারের অনুরোধে অবরোধ তুলে নেওয়া হলেও সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এভাবে ছয় দফা ধর্মঘট পালন করেও বিরোধের সমাধান হয়নি।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রমিকরা হবিগঞ্জের তিনটি বাস আটকে রেখেছেন—এমন অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার আবারও ধর্মঘট শুরু করে হবিগঞ্জের শ্রমিকরা। এতে এক বছরে সপ্তম দফায় দুর্ভোগে পড়েছেন হবিগঞ্জ-সিলেট সড়কপথের যাত্রীরা।
ধর্মঘট চলাকালে হবিগঞ্জ বাস টার্মিনালে সারিবদ্ধভাবে বহু বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। শ্রমিকরা আশপাশের দোকান ও অলিগলিতে সময় কাটান। এ সুযোগে সিএনজি অটোরিকশা ও ম্যাক্সি বাড়তি ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করছে।
মৌলভীবাজার বাসমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রব মিয়ার দাবি, হবিগঞ্জের মাত্র আটটি বাসের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। বাকি গাড়িগুলো ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ। তাই সেগুলো মৌলভীবাজারের সড়কে চলতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ বাসমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল বলেন, যানবাহনের কাগজপত্র যাচাইয়ের দায়িত্ব সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের।মৌলভীবাজারের বাসে যাত্রী কম হওয়ায় তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হবিগঞ্জের বাস চলাচলে বাধা দিচ্ছে। এ রুটে নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান তিনি।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজ বলেন, অতীতে বিভাগীয় কমিশনারের হস্তক্ষেপেও বিষয়টির সমাধান হয়নি। আবারও যাত্রীদুর্ভোগ শুরু হয়েছে। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ধর্মঘটের নেপথ্যে রুট নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের সংঘাত
হবিগঞ্জ বাস টার্মিনালে দুটি বাস সার্ভিস পরিচালনা নিয়েও দীর্ঘদিনের পুরোনো বিরোধ রয়েছে। বিরতিহীন ও সুপার এক্সপ্রেস নামে দুই যাত্রী পরিবহন সার্ভিসের শ্রমিকদের মধ্যে সম্প্রতি ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও বাস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে পুরো টার্মিনালে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
‘হবিগঞ্জ–সিলেট বিরতিহীন এক্সপ্রেস’ নামে একটি সার্ভিস প্রায় ১২৬টি বাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হবিগঞ্জ–সিলেটের তিনটি রুটে যাত্রীসেবা দিয়ে আসছে। জেলার অভ্যন্তরে আরও ২২৪টি বড় বাসসহ অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। এসব বাস হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের অধীনে পরিচালিত হয়।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রতিদিন প্রায় ৭০ হাজার যাত্রী এ পরিবহনব্যবস্থা ব্যবহার করেন। এ খাতে বিপুল অর্থের লেনদেন হয় এবং প্রায় ১২ হাজার মালিক-শ্রমিক জড়িত।
২০০৯ সালে ‘হবিগঞ্জ–সিলেট সুপার এক্সপ্রেস’ নামে আরেকটি সার্ভিস চারটি বাস নিয়ে টার্মিনালে নামলে বিরতিহীনদের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই সুপার এক্সপ্রেসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পরে ২০২০ সালের শেষদিকে কয়েকজন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতার তত্ত্বাবধানে ছয়টি বিআরটিসি এসি বাস এ রুটে চালু করা হয়। তখনও বিরতিহীনদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিসির বাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হতো। ফলে সেবাটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মৌলভীবাজারের বাসশ্রমিকদের সঙ্গে বিরোধ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি ত্রিমুখী রূপ নেয়।





