টাকা দিয়েও নেই সার, বিপাকে কৃষক
- ভুরুঙ্গামারীতে সার লুটকাণ্ডে ডিলারের বিরুদ্ধে রেজিস্টার খাতা ও ভাউচারে অসংগতি, অকৃষকের মধ্যে বিতরণের সত্যতা পায় তদন্ত কমিটি
- কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গত বছরের তুলনায় জেলায় প্রতিটি উপজেলায় সারের বরাদ্দ বেশি এসেছে

চাহিদামাফিক সার পাচ্ছেন না কুড়িগ্রামের কৃষকরা। ছবি: সংগৃহীত
ফসলের মৌসুম সামনে রেখে বাড়ছে সারের চাহিদা। তবে কমছে না প্রান্তিক কৃষকদের ভোগান্তি। কোথাও টাকা দিয়েও মিলছে না সার, আবার কোথাও ১০ কেজি সার প্রয়োজন হলেও ডিলারদের কাছ নিতে হচ্ছে এক বস্তা অর্থাৎ ৫০ কেজি। এর সঙ্গে রয়েছে বাড়তি দামের অভিযোগ। ফলে আমন মৌসুমে সার নিয়ে হতাশা ও শঙ্কায় দিন কাটছে কুড়িগ্রাম জেলার কৃষকদের।
গত ২৩ আগস্ট জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে তাইফুর রহমান মুকুলের মেসার্স শাহ আমানত ডিলার পয়েন্টে সার না পেয়ে গুদামের দরজা ভেঙে প্রায় ১১ হাজার ২৫০ কেজি সার বা ১৯৭ বস্তা নিয়ে যান কৃষকরা। ওই দিন উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে উপজেলা প্রশাসন।
পরদিন সোমবার তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে, স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এবং ডিলারের নথিপত্র পর্যালোচনা করে। এর দুই দিন পর স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের সহযোগিতায় ১২২ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ডিলারের। তার দাবি, ওই এলাকার কৃষকরা এখন সার পাচ্ছেন।
তদন্ত কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ডিলারের রেজিস্টার ও ভাউচারে অসংগতি এবং অকৃষকের মধ্যে সার বিতরণের সত্যতা পেয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, চলতি আমন মৌসুমে কুড়িগ্রামে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় ইউরিয়ার অনুমোদিত বরাদ্দ ৫৩ হাজার ৯৫০ টন। চলতি আগস্ট মাসে চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের সার পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ছিল ৫ হাজার ৮৭৫ টন, মজুদ রয়েছে ১ হাজার ১৬৬ টন। টিএসপির চাহিদা ৯২৪ টন, মজুদ ২১৪ টন। ডিএপির চাহিদা ১ হাজার ৫৭২ টন, মজুদ ২৮৮ টন। আর এমওপি সারের চাহিদা ১ হাজার ৬৪৮ টন, মজুদ রয়েছে ১ হাজার ৪১১ টন।
কৃষকদের সার সংকটে না পড়তে গত ২৫ আগস্ট থেকেই সেপ্টেম্বর মাসের সার উত্তোলনের জন্য ডিলারদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, সার সংকটের পাশাপাশি বাড়তি দামও দিতে হচ্ছে তাদের। জেলার একাধিক উপজেলা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
সদর উপজেলার আরডিআরএস বাজার এলাকার কৃষক আবদুস সবুর এবার পাঁচ একর জমিতে আমন চাষ করেছেন। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘একে তো বৃষ্টি নেই, অন্যদিকে সার পাওয়া যায় না। আবাদের অবস্থা ভালো না। কী যে হবে কে জানে।’
তিনি জানান, অনেক দেনদরবার করে সার পেয়েছেন। তবে সরকারি দামের চেয়ে প্রতি কেজিতে পাঁচ টাকা বেশি দিতে হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
রুহুল আমিন নামে আরেক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এগুলো বলে কী লাভ, আমরা তো সার পাই না। খুচরা দোকানে গেলে বলে সার নেই। আর ডিলারের কাছে গেলে ওনারা কয়, বস্তা নেও। আমরা লাগে ১০ কেজি সার, আমি এত সার নিয়া কী করমু?’
জেলার গত এক সপ্তাহের সারের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউরিয়া সারের সংকট রয়েছে। খোলা বাজারে বা খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে ইউরিয়া কিনতে কৃষকদের প্রতি কেজিতে গড়ে দুই থেকে পাঁচ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। টিএসপির সরকারি মূল্য প্রতি কেজি ২৭ টাকা হলেও স্থানভেদে খুচরা বাজারে তা ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ডিএপির সরকারি মূল্য প্রতি কেজি ২১ টাকা, অথচ খোলা বাজারে কৃষকদের তা কিনতে হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২ টাকা দরে।
ভূরুঙ্গামারীর সার লুটের ঘটনা ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ডিলারের গাফিলতি ধরা পড়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন কৃষকরা। তবে সার নিয়ে সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি তাদের।
কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘অন্য বছরগুলোর তুলনায় জেলায় সারের বরাদ্দ বেশি। কৃষকরা যাতে সার পেতে সংকটে না পড়েন, সেজন্য ডিলারদের সেপ্টেম্বর মাসের সার উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, কৃষকরা যাতে খুচরা পরিমাণে সার কিনতে পারেন, সেজন্য আগের নিয়ম অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতাদেরও সার বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চাহিদার তুলনায় জেলায় পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে দাবি করে কৃষকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।








