বিরামপুর
সেতুর আশ্বাসেই কেটে গেল বছর, ঘুরতে হয় ৭ কিলোমিটার পথ

ছবি: আগামীর সময়
দেশ স্বাধীনের পর থেকেই সেতুর দাবি উঠেছিল। বিভিন্ন সময়ে এসেছে নির্মাণের আশ্বাস, হয়েছে মাপযোগও। কিন্তু ছোট যমুনা নদীর ওপর আজও নির্মাণ হয়নি সেতু। ফলে দিনাজপুরের বিরামপুর ও হাকিমপুর উপজেলার অন্তত ১০ গ্রামের প্রায় ৭০ হাজার মানুষকে নদী পারাপারে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নৌকা না পেলে প্রায় সাত কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, রোগী ও পানচাষিরা।
বিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী চৌঘুরিয়া গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট যমুনা নদী। নদীর পূর্ব পাশে হাকিমপুর উপজেলার নয়ানগর গ্রাম। একটি সেতু না থাকায় নদীর পশ্চিম পাড়ের চৌঘুরিয়া, রামচন্দ্রপুর, রণগাঁও, দামোদরপুর ও দাউদপুর গ্রামের মানুষকে কাটলাবাজার ও খট্টামাধবপাড়া হয়ে মোটরসাইকেল, রিকশা-ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে নয়ানগর এলাকায় যেতে হয়। এতে স্বাভাবিক পথের তুলনায় প্রায় সাত কিলোমিটার বেশি ঘুরতে হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণ হলে দুই উপজেলার মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে, কমবে সময় ও যাতায়াতের খরচ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দাবি থাকলেও বাস্তবে সেতু নির্মাণের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।
এলাকার শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি আরও বেশি। চৌঘুরিয়া, দামোদরপুর ও রণগাঁওসহ আশপাশের গ্রামের শতাধিক শিক্ষার্থী নদীর ওপারে নয়ানগর উচ্চবিদ্যালয় ও হাকিমপুর ডিগ্রি কলেজে পড়াশোনা করে। বর্ষায় নদীতে পানি বেড়ে গেলে সময়মতো নৌকা পাওয়া যায় না। অনেক সময় ঘাটে মাঝি না থাকায় শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হয়। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে নিজেরাই বৈঠা ধরে বা দড়ি টেনে নৌকা পার করেন।
চৌঘুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও নয়ানগর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিজানুর হোসেন বলেন, ‘মঙ্গলবার স্কুলে যাওয়ার সময় ঘাটে মাঝি না থাকায় প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। দেরি হওয়ায় প্রথম ক্লাস করতে পারিনি। বর্ষায় নদীতে পানি বেশি থাকায় নৌকায় পার হতেও ভয় লাগে। ঘাটলা না থাকায় নৌকায় ওঠানামার সময় অনেকে পানিতে পড়ে যান।’
নয়ানগর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিয়ার রহমান বলেন, চৌঘুরিয়া ও আশপাশের গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। সেতু না থাকায় এবং ঘাটে সময়মতো মাঝি না পাওয়ায় তারা প্রায়ই বিদ্যালয়ে দেরিতে আসে।
শুকনো মৌসুমে ঘাটের ইজারাদার নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করে পারাপারের ব্যবস্থা করেন। তবে অতিরিক্ত মানুষের চলাচলে অল্প সময়ের মধ্যেই সাঁকোটি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এতে রিকশা-ভ্যান বা পান বহনকারী যানবাহন পারাপার করা সম্ভব হয় না। ফলে এসব যানবাহনকে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে ঘুরে যেতে হয়।
এলাকার অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। চৌঘুরিয়া, দামোদরপুর, রামচন্দ্রপুর, রণগাঁও ও দাউদপুর গ্রামে দুই হাজারের বেশি পানবরজ রয়েছে। চাষিরা উৎপাদিত পান বিক্রির জন্য হাকিমপুরের হিলি হাটে যান। খেয়া পারাপারের ঝুঁকি এড়াতে অনেক সময় তাদের প্রায় সাত কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। একইভাবে হাকিমপুর উপজেলার মোংলা, নয়ানগর, খট্টামাধবপাড়া ও ঘাসুড়িয়া গ্রামের মানুষকেও বিকল্প পথে চলাচল করতে হয়। বিশেষ করে রোগী পরিবহন ও কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে ভোগান্তি বেশি।
চৌঘুরিয়া গ্রামের পানচাষি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর থেকেই শুনে আসছি এখানে সেতু হবে। অনেকবার মাপজোখও হয়েছে। কিন্তু এত বছরেও সেতু হলো না। বেঁচে থাকতে এই সেতু দেখে যেতে পারব কি না, জানি না।’
বিরামপুর উপজেলা প্রকৌশলী আতাউর রহমান বলেন, চৌঘুরিয়া নদীর ঘাটে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে প্রায় তিন বছর আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে ডিও লেটার দিলে সেতুটির জন্য বরাদ্দ পাওয়া সহজ হবে বলে তিনি জানান।





