বরিশাল
সংকটের বড় নাম ‘চিকিৎসক’
- স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিবন্ধকতা বরিশালে
- দন্ত চিকিৎসক দিয়ে চলছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
- কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় হাজার চিকিৎসক

ছবি : এআই
ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার সম্ভুপুর ইউনিয়নের গোলকপুর গ্রামের বাসিন্দা লক্ষ্মী রানী দাস। হঠাৎ একদিন তীব্র পেট ব্যথা নিয়ে ছুটে যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে গিয়ে পাননি কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা। পেট ব্যথার রোগী হলেও তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন একজন দন্ত চিকিৎসক। পরে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ওই চিকিৎসকই তাকে ভোলা সদর হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
লক্ষ্মী রানীর ছেলে নিত্যলাল দাস ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, ‘উপজেলা হাসপাতালে পেট ব্যথারও চিকিৎসা হয় না। ভোলায় ডাক্তার দেখিয়ে জানতে পারি, গ্যাসের সমস্যায় মায়ের সাময়িক ব্যথা হয়েছিল।’
শুধু লক্ষ্মী রানী দাসের মতো পেট ব্যথার রোগীই নন, তজুমদ্দিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জ্বর, হাড় ভাঙা, কাটাছেঁড়া, ফাটা কিংবা শিশুদের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাও দিতে হচ্ছে দুই দন্ত চিকিৎসককে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতেই রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা। তাদের ওপর নির্ভর করেই চলছে উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। ফলে ভোগান্তিতে উপজেলার প্রায় দেড় লাখের বেশি মানুষ।
হাসপাতালে কর্মরত সহকারী ডেন্টাল সার্জন আতিকুল হক জানিয়েছেন, আন্তঃবিভাগের ভর্তি রোগীর পাশাপাশি নিয়মিত ২০০ থেকে ৩০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। বেশিরভাগ রোগীই শিশু এবং জটিল রোগে আক্রান্ত। ফলে চরাঞ্চল থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসে এখান থেকে অনেকটা হতাশা নিয়েই ফিরতে হয় রোগীদের।
আরেক সহকারী ডেন্টাল সার্জন শিমনুল ইসলাম বলছেন, ‘কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন হলেও হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের দেখতে হয়। কোনো গাইনি মুমূর্ষু রোগী আসলে তাদের ভোলা হাসপাতালে রেফার করে দেই।’
উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা মিন্টুর ভাষ্য, এই হাসপাতালের অবস্থা খুবই করুণ। জোড়াতালি দিয়ে চলছে। দুজন দাঁতের ডাক্তার আছেন। তারা যেভাবে পারছেন রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে ৪৫ কিলোমিটার দূরে ভোলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে— অসুস্থ রোগী ভোলায় নেওয়ার পথেই মারা গেছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাহাত হোসেন জানিয়েছেন, চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিভাগে চিকিৎসক সংকটের কারণে চরমে পৌঁছেছে রোগীদের ভোগান্তি। এর মধ্যে চিকিৎসক সংকটের সব থেকে বড় প্রভাব পড়েছে তজুমদ্দিন ও বরগুনার বামনা উপজেলায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বরিশাল বিভাগের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাদে চিকিৎসক পদ রয়েছে ১৮৬৭টি। এই পদের অনুকূলে চিকিৎসক মাত্র ৬৭৫ জন। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ৪৩৯ পদের বিপরীতে ২২৪, ভোলায় ৩৮৩ পদের বিপরীতে ১০৩, ঝালকাঠিতে ২০০ পদের বিপরীতে ৫৮, পটুয়াখালীতে ৩৩৩ জনের বিপরীতে ১২০, পিরোজপুরে ২৯৫ জনের বিপরীতে ৯২ এবং বরগুনায় ২১৭ পদের বিপরীতে রয়েছে মাত্র ৭৪ জন চিকিৎসক।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল মন্তব্য করেন, দুটি উপজেলা বাদে সব জায়গায় চিকিৎসাসেবা যথাযথভাবে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা হয়। তবে কর্মরত চিকিৎসক খুবই কম। রোগীদের যে চাপ তাতে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাটা কষ্টকর। আমরা চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। আশা করছি কিছু চিকিৎসক বরিশালে নিয়োগ হবে। তা ছাড়া ২ হাজার ৯১০ পদের বিপরীতে ২ হাজার ৭৪৫টি পদে আছে সিনিয়র নার্সরা। তারা ঠিকভাবেই চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
বরিশাল বিভাগের ৬ জেলা ও ৪২ উপজেলার অধিকাংশ নদীমাতৃক হওয়ায় যাতায়াত সমস্যা রয়েছে। আর এই সমস্যার কারণে চিকিৎসকরা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালীর বেশ কয়েকটি উপজেলায় কর্মরত থাকতে অনীহা প্রকাশ করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পোস্টিং দেওয়া হলেও পরে নানা তদবির করে সরে যায় চিকিৎসকরা। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত হয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে।
অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের শেষ ভরসাস্থল ও প্রধান ভরসা শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও প্রবল রূপ ধারণ করেছে চিকিৎসক সংকট।
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ১০০০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ২ সহস্রাধিক রোগী আন্তঃবিভাগে এবং ২ সহস্রাধিক রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নেয়। ১০০০ বেডের এই হাসপাতালে প্রায় ৫ হাজার রোগীর চিকিৎসা দিতে ৫৭১টি চিকিৎসক পদ আছে। তবে এর মধ্যে ২৪০টি পদই শূন্য। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ২৪৮ পদের মধ্যে শূন্য ১৪৬টি। আর সাধারণ চিকিৎসকের ৩২৩ পদের মধ্যে ৯৪টি শূন্য।
হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বললেন, ‘চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে আমাদের বেগ পেতে হয়। মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানে। হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগী চিকিৎসা নেয় সেই তুলনায় চিকিৎসক নেই, তবু আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
গবেষক দেবাশীষ চক্রবর্তী মনে করেন, বরিশাল বিভাগের এই সংকট নিরসনে বিশেষ পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রায় ১ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব মাত্র হাজারখানেক চিকিৎসকের কাঁধে। তাদের ওপর কতটা চাপ সেটা না দেখলে বোঝা যায় না। বহু বছর ধরেই বরিশালে চিকিৎসক সংকট। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের বিভাগীয় শহরে আসতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।
‘যাতায়াতব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় চিকিৎসার অভাবে এই অঞ্চলের অনেক মানুষ মারা গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ করলে সংকট অনেকাংশ কমে যাবে। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর বিভাগের রোগীদের একটা চাপ থাকে, সেটাও কমবে। এতে রোগীদের ভোগান্তি কমে যাবে অনেকাংশ।’
প্রতিবেদনটিতে সহায়তা করেছেন ভোলা প্রতিনিধি মলয় দে




