১০ লাখ টাকার ড্রেনের দেয়ালে ফাটল, ভরসা কাঠের ঠেকা

ড্রেনের দেয়ালে ফাটল এবং আরেক পাশ কাঠের ঠেকা দিয়ে ধরে রাখা হয়েছে— সংগৃহীত
ড্রেনটি পুরোপুরি তৈরি হয়নি। কোথাও নির্মাণকাজ চলছে, কোথাও পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। এরই মধ্যে চোখে পড়ে দেয়ালের ফাটল। একটি অংশে ভেঙে পড়েছে দেয়াল। আর সেই ভাঙা কাঠামোকে সাময়িকভাবে ধরে রাখতে দুই পাশের দেয়ালের মাঝে বসানো হয়েছে কাঠের ঠেকা।
গাজীপুরের কালীগঞ্জের বাহাদুরসাদী ইউনিয়নের বাশাইর বণিকপাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ড্রেনের চিত্র এটি।
ড্রেনটি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য নিষ্কাশনের সমস্যা দূর করা। সরকারি অর্থে শুরু হওয়া এই কাজ শেষ হলে বর্ষায় পানি দ্রুত সরে যাবে— এমন প্রত্যাশাই ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই দেয়ালে ফাটল ও একটি অংশ ধসে পড়ার ঘটনায় এখন কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ড্রেনের কয়েকটি অংশে ফাটলের চিহ্ন রয়েছে। একটি অংশের দেয়াল ধসে পড়েছে। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত রডের দূরত্ব ও কাঠামো নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, নির্মাণকাজে সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণ ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহারে যথাযথ মান অনুসরণ করা হয়নি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নির্মাণকাজের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘বৃষ্টির মধ্যে ড্রেন নির্মাণের কাজ করায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ ফুট অংশ নষ্ট হয়েছে।’
গতকাল তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে প্রকল্পের সভাপতিকে ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি সঠিকভাবে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে প্রকল্পের সভাপতি ও বাহাদুরসাদী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ইউপি সদস্য শওকত আলী বললেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে দুই-তিন হাত জায়গা ভেঙে পড়েছিল। পরে সেটি সংস্কার করা হয়েছে।’
তার দাবি, উপজেলা থেকে পিআইও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সব ঠিক আছে বলে জানিয়েছেন।
তবে নির্মাণকাজে রডের ব্যবধান, উপকরণের অনুপাত এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্নির্মাণের কারিগরি মান যাচাই করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো পরীক্ষার ফল বা নথি প্রকাশ্যে আসেনি।
প্রকল্প বাস্তবায়ন-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাশাইর বণিকপাড়ার ভেতর দিয়ে নির্মাণাধীন ড্রেনটি বাশাইর মূল সড়কের পাশের ড্রেনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা।
গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় তিন দফায় এ প্রকল্পে মোট ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। প্রথম দফায় ৪ লাখ, দ্বিতীয় দফায় ৪ লাখ এবং পরবর্তী দফায় ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঐচ্ছিক প্রকল্প হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে কাজটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রকল্পটির নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার বিষয়টি কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ. টি. এম. কামরুল ইসলামের নজরেও এসেছে।
মোবাইলে তিনি জানালেন, বিষয়টি জানার পর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে কাজটি পরিদর্শন করে সঠিকভাবে যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন। যাচাইয়ের পর যেন বিল প্রদান করা হয়, সে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রকল্পটির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেই যাচাই।
কারণ, একটি অংশ পুনর্নির্মাণ করলেই নির্মাণকাজের সামগ্রিক মান নিশ্চিত হয় না। নকশা অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না, রড ও অন্যান্য উপকরণ নির্ধারিত মানের কি না এবং নির্মাণপ্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না— এসব বিষয় কারিগরি যাচাইয়ের মাধ্যমেই স্পষ্ট হতে পারে।
বণিকপাড়া এলাকার মানুষের প্রত্যাশা, ড্রেনটি যেন শুধু নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য নির্মিত না হয়; বরং দীর্ঘদিন পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশনের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ও টেকসই হয়।
কাজ শেষ হওয়ার আগেই ফাটল ও ধস সেই প্রত্যাশায় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন স্থানীয়দের অপেক্ষা-কাঠের ঠেকার বদলে ড্রেনটি শেষ পর্যন্ত কতটা শক্ত ও টেকসই হয়ে ওঠে।





