নমুনাতেই শেষ ১৮ কোটির গবেষণা
- উদ্ভাবিত প্রযুক্তি উৎপাদন পর্যায়ে নেওয়া যাচ্ছে না কার্যকর সংযোগের অভাবে
- রোবট ও ভেন্টিলেটর পড়ে আছে দুই গবেষকের বাড়িতে
- কণ্ঠনির্দেশনাভিত্তিক হুইলচেয়ার পড়ে আছে গবেষণাগারে

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) যেসব প্রযুক্তির উদ্ভাবন একসময় সম্ভাবনার দ্বার খুলেছিল, তার অনেকগুলোই এখন সীমাবদ্ধ গবেষণাগারের নমুনা, প্রদর্শনী আর গবেষণাপত্রে। এসব উদ্ভাবন মানুষের ব্যবহারিক জীবনে পৌঁছানোর কথা থাকলেও এখনো তা আটকে আছে প্রাথমিক নমুনা পর্যায়ে। ফলে দীর্ঘ সময়ের শ্রম এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গবেষণায় উদ্ভাবিত এসব প্রযুক্তির সুফল মানুষ পায়নি। ভেন্টিলেটর, রোবট, হাইব্রিড গাড়ি আর কণ্ঠনির্দেশনাভিত্তিক হুইলচেয়ার— এসবের কোনোটি পড়ে আছে গবেষকের বাড়িতে আবার কোনোটি গবেষণাগারে।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) ১০ বছরে গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৮ কোটি ১৭ লাখ ১৩ হাজার ৪৮২ টাকা। স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, রোবট প্রযুক্তি, টেকসই অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব গবেষণা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উদ্ভাবন করেছেন সময়োপযোগী নানা প্রযুক্তি। তবে এসব উদ্ভাবনের বাস্তব প্রয়োগ এবং তা বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর্যায়ে নিতে না পারায় কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগের সুফল এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।
করোনা মহামারীর সময় রাজশাহীতে ভেন্টিলেটরের সংকট দেখা দিলে রুয়েটের শিক্ষার্থীদের গবেষক দল ‘দুর্বার কাণ্ডারি’ কম খরচে ব্যবহারযোগ্য একটি ভেন্টিলেটর উদ্ভাবন করে। এটি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পরীক্ষামূলক ব্যবহারও করা হয়। উদ্ভাবনটি সেসময় বেশ আলোচনায় এলেও পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর এটি নিয়মিত ব্যবহারের উদ্যোগ আর এগোয়নি। বর্তমানে ভেন্টিলেটরটি পড়ে আছে এক গবেষকের বাড়িতে।
প্রায় একই সময়ে রুয়েটের আরেকটি গবেষক দল তৈরি করে ‘ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম’ নামের বিশেষায়িত রোবট। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছিল এটি। উদ্ভাবনের পর রোবটটি ব্যাপক সাড়া ফেললেও এর ব্যবহারিক প্রয়োগের উদ্যোগ আর বেশিদূর এগোয়নি। বর্তমানে এটিও পড়ে আছে এক গবেষকের বাড়িতে। শুধু ভেন্টিলেটর বা রোবটই নয়, রুয়েটের আরও অনেক উদ্ভাবনেরও হয়েছে একই পরিণতি।
২০১৯ সালে কম খরচে পরিবেশবান্ধব একটি গাড়ি তৈরি করে প্রশংসিত হন রুয়েটের শিক্ষার্থীরা। ‘হাইব্রিড কার’ নামে পরিচিত ওই গাড়িটি পরিবেশবান্ধব ও কম খরচের প্রযুক্তির উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় আসে। তবে এর ব্যবহারিক প্রয়োগ কিংবা বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি।
প্রতিবন্ধীদের চলাচলের সুবিধার জন্য এখানকার গবেষকরা তৈরি করেছিলেন কণ্ঠনির্দেশনাভিত্তিক হুইলচেয়ার। এটি এখনো গবেষণাগারেই পড়ে আছে।
রুয়েটের গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালে। এরপর থেকে প্রতি বছর গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। রুয়েটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে ১৮ কোটি ১৭ লাখ ১৩ হাজার ৪৮২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৬টি প্রকল্পে ২ কোটি ৫০ লাখ ২ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৪টি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার ৫৩৯ টাকা । ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৫টি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
ইমার্জেন্সি মেডিকেল ভেন্টিলেটর ও স্প্রেড হুইলচেয়ার প্রকল্পের গবেষক অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা বললেন, গবেষকরা সফলভাবে নতুন প্রযুক্তি ও কাঠামো উদ্ভাবন করছেন। তবে এসব প্রযুক্তি উৎপাদন পর্যায়ে নেওয়া যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দিলে এসব উদ্ভাবনের বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব হতো।
রুয়েটের গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. আব্দুল খালেক মনে করেন, গবেষণাগারের একটি সফল উদ্ভাবনকে বাজারে পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি পেটেন্ট, প্রোটোটাইপ উন্নয়ন, বাণিজ্যিক পরীক্ষা এবং ইউজিসির গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রয়োজন।
রুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। অনেক কার্যকর ও জরুরি জিনিস তৈরি হচ্ছে। এগুলো বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যৌথভাবে করা যেতে পারে। এজন্য বড় বাজেটের প্রয়োজন। সরকার বাজেট দিচ্ছে। তবে ইন্ডাস্ট্রি যদি আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে এসব গবেষণাকে দ্রুত বাস্তবমুখী করা যাবে।




