এসএসসির ফল শিক্ষার মানের দিকে এগোনোর ইঙ্গিত

ছবি: শামীম-উস-সালেহীন
নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ পরে প্রকাশিত হলো এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। এবার এসএসসি পরীক্ষার ফল বিলম্ব হচ্ছে দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম কিছু একটা হতে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করলে পাসের হার ২০ শতাংশের ওপরে-নিচে ঘোরাঘুরি করার কথা। কিন্তু পাস করে আসছিল প্রায় শতভাগ!
শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন— সবাই এই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিচ্ছিল। এর বিরুদ্ধে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু এভাবে চলতে দিলে জাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়াবে; যেকোনো সময় একেবারে নিচে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। এ সময় দরকার মহা সাহসী, মহা বিপ্লবী কোনো পদক্ষেপ— আর সে রকম একজন কাণ্ডারী হচ্ছেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি একজন মানুষ, ফেরেশতা নন। তাই তার মানবিক কিছু ত্রুটি থাকবে, সেটি আমরা উপেক্ষা করব। বাকি ক্ষেত্রে তার প্রতিটি পদক্ষেপকে আমাদের সহায়তা দিয়ে যেতে হবে, যদি আমরা দেশের মানুষের, শিক্ষার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মঙ্গল চাই।
এবার সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে গড় পাসের হার ৬৪.০৫ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৬৮.০৪ শতাংশ; অর্থাৎ পাসের হার ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ কমেছে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন পরীক্ষার্থী, যা গতবার ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। সর্বমোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে এবং ৩১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা থেকেও কেউ পাস করেনি। অন্যদিকে ৬৯৯টি প্রতিষ্ঠানের সবাই পাস করেছে। এবারও মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে; তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮২ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯ হাজার ৯ জন। গত বছরের তুলনায় সার্বিক পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ কমেছে ২২ হাজার ৩৬৫টি। মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা সর্বনিম্ন; অথচ অযথাই প্রতিবছর এই বোর্ডে পাসের হার বেশি দেখা যেত।
গত ৮ জুন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে ২০ জুলাই। প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১০ আগস্ট পাওয়া গেল এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল।
২৭ জুলাই আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬-এর ফলাফল ১০ আগস্ট সারা দেশে একযোগে প্রকাশ করা হবে এবং সেভাবেই ফল প্রকাশিত হয়েছে। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয় ২১ এপ্রিল, চলে ২০ মে পর্যন্ত। এরপর ছিল ব্যবহারিক পরীক্ষা। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় এ বছর পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি। এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ; তারাই একদিন দেশের সব দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবে, হাল ধরবে। কাজেই তাদের সেভাবেই প্রস্তুত করতে হবে। যেনতেনভাবে পাস করিয়ে আর না পড়িয়ে শুধু গ্রেড দিয়ে বরং তাদের ক্ষতি করা হচ্ছিল। সেই অবস্থা থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া মাত্র শুরু হলো।
কোনো একটি জায়গা থেকে সংশোধন শুরু করা দরকার এবং সেই শুরুটা অন্তত মাধ্যমিকের ফল দিয়ে শুরু হলো বলা যায়। এই ফল দেখে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার টেবিলে বসবে; আর যেসব অভিভাবক চান তাদের ছেলেমেয়েরা কিছু জানুক আর না জানুক জিপিএ-৫ পেতেই হবে, তাদের জন্যও কিছুটা সতর্ক সংকেত হয়ে থাকবে এই ফল।
২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ওই বছর পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটিই কমেছিল, যা ছিল গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। করোনা মহামারির মধ্যে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হওয়া ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১০ সালে গড় পাসের হার ৭৮ দশমিক ৯১ শতাংশ হওয়ার পর থেকে এই সময়কালের মধ্যে কেবল ২০১৮ সালে পাসের হার ছিল সবচেয়ে কম—৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে সেটিও ছিল এবারের চেয়ে অনেক বেশি। এর আগে ২০০৯ সালে পাসের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ।
এগুলোর কোনোটিরই কিন্তু সঠিক কোনো কারণ ও ব্যাখ্যা শিক্ষা বোর্ডগুলো কিংবা শিক্ষা বিভাগের কাছে যথাযথভাবে নেই। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য তাদের তৈরি করা কিছু বাঁধাধরা উত্তর বা হঠাৎ করে মন্তব্য করার প্রবণতা আমরা প্রতি বছরই দেখি।
শিক্ষা বিভাগের জাতীয় পর্যায়ের এই মহামূল্যবান অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম নিয়ে দেখা যায়, যারা এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত— অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক, যারা শিক্ষার্থীদের ষষ্ঠ শ্রেণি (কোথাও কোথাও প্রথম শ্রেণি) থেকে তৈরি করে বোর্ডে পাঠিয়ে থাকেন— তাদের তেমন কোনো কথা, মূল্যায়ন বা মতামত আমরা জাতীয় পর্যায়ে প্রতিফলিত হতে দেখি না। এসব নিয়ে যারা কথা বলেন, তাদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সিলেবাস, পড়াশোনার ধরন কিংবা সমস্যাবলী সম্পর্কে তেমন গভীর ধারণা নেই। সাংবাদিকরা তাদের দিকেই ক্যামেরা তাক করে রাখেন মূল্যবান কিছু শোনার জন্য। প্রকৃতপক্ষে এসব স্তর সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই; তারা অনুমানভিত্তিক, শুধুমাত্র সংবাদপত্রের রিপোর্ট এবং চারদিকের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে কিছু মন্তব্য করেন— যা বাস্তবতার ও মূল কারণের সাথে অনেকটাই মেলে না। ফলে বোর্ডের একেক বছর একেক ধরনের ফল আসা, এক বোর্ড থেকে অন্য বোর্ডে ফলের বিশাল পার্থক্য থাকা এবং শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতা ও জ্ঞানের তারতম্য কেন হচ্ছে ও এর বাস্তবসম্মত সমাধান কী হতে পারে— এসব প্রশ্ন অধরাই থেকে যায়।
শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারকে বড় ভূমিকা রাখতে হবে, তবে শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা জানি, মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা অর্জনে বেশ পিছিয়ে। এমনকি বাংলাতেও শিক্ষার্থীদের অবস্থা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। মূলত বিদ্যালয়গুলোতে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা কোচিং ও গৃহশিক্ষকের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়। এ অবস্থা সরকার হঠাৎ করে বন্ধ করে দিতে পারবে না; সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রায় অর্ধেকে প্রধান শিক্ষক নেই, এই সমস্যা বছরের পর বছর ধরে লেগে আছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি; এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য, অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই। আর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা কী, তা তো আমরা সবাই জানি।
দেশের ৫৫ শতাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই এবং ১৮ শতাংশের বেশি পদে সহকারী শিক্ষক নেই। দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২টি; এর মধ্যে ৩৮৩টি বিদ্যালয়ই প্রধান শিক্ষকবিহীন চলছে। সহকারী প্রধান শিক্ষকের ২৪৯টি পদ শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার ১৫ হাজার ২৯৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য। এতে একদিকে যেমন বিদ্যালয়গুলো নেতৃত্বের সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের অনেক বিষয়েই শিখন-ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
বদলি ও পেনশনগত কারণে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসকদের পদ সব সময়ই খালি হবে; কিন্তু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ও শিক্ষা প্রশাসনে যাতে এর প্রভাব না পড়ে, সেজন্য বিকল্প ব্যবস্থা ও দ্রুত পরিকল্পনা (কন্টিনজেন্সি প্ল্যান) থাকা প্রয়োজন। এ নিয়েও বহু বছর ধরে লিখে যাচ্ছি কীভাবে বিকল্প পরিকল্পনা করতে হবে। কিন্তু জনবল সংকটে শিক্ষা প্রশাসনের স্থবিরতা চলছেই!
মাউশির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালকের ১০টি পদই বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া ৬৪টি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদের মধ্যে ২৩টি শূন্য। বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদের সব কটিই খালি। প্রশ্ন হচ্ছে, মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামোয় যদি এমন শূন্যতা থাকে, তাহলে এই স্তরের শিক্ষার তদারকি ও পরিচালনা কীভাবে হবে?
এ তো গেল সরকারি বিদ্যালয় ও প্রশাসনের কথা। কিন্তু যেসব ২০ হাজার বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দেশের আশি শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে, তাদের অবস্থার কথা তো কেউ বলেই না! শুধু ৭০২টি সরকারি স্কুলের কথাই আমরা বলছি; কিন্তু বেসরকারিগুলোর যে কী করুণ অবস্থা, তা আমরা জানি। কারণ আমরা অনবরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলি, শ্রেণিকক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখি। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
টানা প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে পরীক্ষার ফল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রকাশের অভিযোগ নয়, বরং স্পষ্ট প্রমাণ ছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। অন্তর্বর্তী সরকার সেই পথে হাঁটেনি। কারণ, যুগ যুগ ধরে ‘দয়ার পাস, খয়রাতির পাসের’ ওপর চলছিল দেশের মহামূল্যবান মূল্যায়ন ব্যবস্থা। একজন শিক্ষক হিসেবে এবং বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক হিসেবে দেখেছি— পরীক্ষার খাতা ঠিকমতো মূল্যায়ন করলে নিতান্তই কম সংখ্যক শিক্ষার্থী পাসের তালিকায় পড়ে, অথচ সেটিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে পাসের হার শতভাগে নিয়ে যাওয়ার জন্য সব ধরনের মেকানিজম ব্যবহার করা হতো। ফলে শিক্ষার মান প্রায় শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকেছে। এ থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে হবে। তাই কোনো একটি জায়গা থেকে সংশোধন শুরু করা দরকার এবং সেই শুরুটা অন্তত মাধ্যমিকের ফল দিয়ে শুরু হলো বলা যায়। এই ফল দেখে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার টেবিলে বসবে; আর যেসব অভিভাবক চান তাদের ছেলেমেয়েরা কিছু জানুক আর না জানুক জিপিএ-৫ পেতেই হবে, তাদের জন্যও কিছুটা সতর্ক সংকেত হয়ে থাকবে এই ফল।
লেখক: গবেষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ—ব্র্যাক শিক্ষা






