অলিরও কথা শুনে...

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি চরম বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কারণ রাজনৈতিক জীবনে অলি আহমদ সব সময় জামায়াতবিরোধী অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের ‘পাওয়ার পলিটিকস’ বা ক্ষমতার রাজনীতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নীতি বা আদর্শের চেয়ে এখানে টিকে থাকা এবং ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ই মুখ্য হয়ে ওঠে।
কর্নেল অলি আহমদ সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানী হিসেবে তার আলাদা খ্যাতি রয়েছে। তবে পরে বিএনপির রাজনীতিতে তার অবস্থান সংকুচিত হওয়ার পেছনে জামায়াতের সঙ্গে তার তীব্র মতভেদের একটি বড় ভূমিকা ছিল। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে মনোনয়ন দ্বন্দ্বের পর থেকে বিএনপির সঙ্গে তার বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। নির্বাচনে জয়ের পর চারদলীয় জোট সরকার গঠন করা হলেও অলি আহমদকে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিত্ব না দিয়ে একপ্রকার সাইডলাইনে বসিয়ে রাখা হয়। ২০০৬ সালে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে তিনি এলডিপি গঠন করেন এবং মাঝখানে কিছুকাল সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিএনপি ছাড়ার পর তিনি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চরম বিষোদ্গার করেন। এমনকি ‘মা খারাপ হলে ছেলে ভালো হয় কীভাবে?’— এমন বিতর্কিত মন্তব্যও করেছিলেন, যা সে সময় পত্রিকায় বড় শিরোনাম হয়েছিল। এসব বক্তব্যের পর বিএনপির রাজনীতিতে তার আর ফেরার কোনো রাস্তা খোলা ছিল না।
আমাদের দেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ আমৃত্যু রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক বা রেলেভেন্ট থাকতে চান; রাজনীতির স্বাদ সহজে ছাড়তে চান না। সেই ধারাবাহিকতায় অলি আহমদ হয়তো ভেবেছেন, এ মুহূর্তে জামায়াতের হাওয়া বা বাজার ভালো, তাই তাদের জোটে যাওয়া বা তাদের সমর্থনে লড়াই করাটা রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য লাভজনক হতে পারে। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা জামায়াতের মতো একটি দল যখন নিজস্ব কোনো নেতাকে প্রার্থী না বানিয়ে অলি আহমদের মতো একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি পদে নমিনেশন দেয়, সেখানেও একটি সূক্ষ্ম প্রদর্শনী কৌশল ও ন্যারেশনের রাজনীতি কাজ করে। এটি দেখিয়ে জনগণকে একটি বিভ্রান্তিকর বার্তা দিতে চায়, তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি নয়। কিন্তু জামায়াত ও অলি আহমদ দুজনই খুব ভালো করে জানেন, ভোটযুদ্ধে তাদের জিতে আসার কোনো সুযোগ নেই। বাস্তবে পুরো বিষয়টি এক ধরনের রাজনৈতিক ‘মকারি’ বা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।
অথচ রাষ্ট্রপতি পদটি একটি রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব এবং অলংকারিক ঐক্যের প্রতীক। সংবিধান অনুযায়ী এই পদের বিশেষ কোনো নির্বাহী ক্ষমতা না থাকলেও কোনো জাতীয় রাজনৈতিক সংকটকালে রাষ্ট্রপতি অভিভাবকসুলভ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সে জন্য এই চেয়ারটির প্রতি সর্বজনীন সম্মান থাকা উচিত এবং এখানে কোনো নির্বাচন না হয়ে একটি সর্বসম্মত জাতীয় ঐকমত্য থাকা বাঞ্ছনীয়।
মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা জামায়াতের মতো একটি দল যখন নিজস্ব কোনো নেতাকে প্রার্থী না বানিয়ে অলি আহমদের মতো একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি পদে নমিনেশন দেয়, সেখানেও একটি সূক্ষ্ম প্রদর্শনী কৌশল ও ন্যারেশনের রাজনীতি কাজ করে
এই বাস্তবতায় নির্বাচন এড়াতে পারলে দেশের রাজনীতির জন্যই শুভ হতো। বিএনপি থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গুটি কয়েক রাজনীতিবিদের ‘ভদ্রলোক’ হিসেবে সুনাম ও খ্যাতি আছে, মির্জা ফখরুল নিঃসন্দেহে তাদের অন্যতম। কোনো দলীয় ইগো যদি না থাকে, তবে তার ব্যাপারে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কোনো আপত্তি বা রিজার্ভেশন না থাকাই বাঞ্ছনীয়। বিএনপির উচিত ছিল অন্য সব দলের সঙ্গে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে তাকে একজন ‘কনসেনসাস ক্যান্ডিডেট’ বা সর্বসম্মত প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করা। একই সঙ্গে এটি নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হলে তিনি কোনো দলের অনুগত না হয়ে সত্যিকার অর্থেই রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবেন। এমন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ বা অ্যাপ্রোচ সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারত। কিন্তু সে ধরনের সংলাপ বা বোঝাপড়া ছাড়াই জামায়াত যখন আলাদা প্রার্থী দাঁড় করায়, তখন বুঝতে হবে যে তারা শুধু বিরোধিতার খাতিরেই বিরোধিতার রাজনীতি করছে।
আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে দেখা যায়, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের মতো দু-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ রাষ্ট্রপতিই কোনো না কোনো দলের অনুগত ও ‘বসন্তের কোকিল’ ছিলেন। যখনই দলীয় লেজুড়বৃত্তির কাউকে বসানো হয়, তখনই রাষ্ট্রপতির চেয়ারের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এবং জনগণ তাকে মন থেকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না।
জাতীয় সংসদে টু-থার্ড মেজরিটি থাকার কারণে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় যেখানে সুনিশ্চিত, সেখানে জামায়াত ও অলি আহমদের এই প্রার্থিতা স্রেফ রাজনৈতিক সুবিধাবাদেরই একটি রূপ। এর ফলে মাঠের রাজনীতিতে এখন যা ঘটবে তা হলো— অলি আহমদরা জামায়াতে যাওয়ার কারণে জামায়াতের ব্যাপারে তাদের সুর নরম হবে, আর জামায়াতও অলি আহমদদের মতো পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ইমেজ ও সফট টোন বজায় রাখার সুযোগ পাবে। নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে শুধু রাজনীতিতে টিকে থাকার এই দেউলিয়াত্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই আরও কলঙ্কিত করে।
লেখক: গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক





