রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ ডেঙ্গু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি রোগের আশঙ্কা নয়, হয়ে উঠেছে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। একদিকে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, অন্যদিকে প্রাণ হারাচ্ছে শিশুসহ ক্যাম্পের বাসিন্দারা। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই ক্যাম্পগুলোয় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৮৮২ জন। এর মধ্যে মারা গেছে ১০ জন। মৃতদের ছয়জনই শিশু। কক্সবাজারের সামগ্রিক ডেঙ্গু পরিস্থিতিতেও ক্যাম্পগুলোর ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট। একই সময়ে পুরো জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৩৩ জন। অর্থাৎ জেলার মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা।
এদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই সীমাবদ্ধ নেই। কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৩২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ২৮ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৩ জন।
গত সোমবার কক্সবাজারের সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ডেঙ্গু পরিস্থিতির সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুদের এ মৃত্যুর সংখ্যা ক্যাম্পে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বসবাসের পরিবেশ বিবেচনায় ক্যাম্পগুলোয় ডেঙ্গুর বিস্তার স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য বাড়তি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ক্যাম্পের ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে। সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের পাশাপাশি পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি করছে। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এ ঝুঁকি আরও বাড়ে।
উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এহসান উল্লাহ সিকদারের ভাষ্য, ক্যাম্পের ঘনবসতি ও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বিবেচনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা এবং মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় ডেঙ্গু পরিস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও হাসপাতালে রেফারের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে’— যোগ করলেন তিনি।
ক্যাম্পে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং লার্ভা নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে উল্লেখ করে তিনি জানালেন, ক্যাম্প জুড়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার অব্যাহত রয়েছে।
তার মতে, শুধু হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বলছিলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে ক্যাম্পবাসী, বিভিন্ন অংশীজন, স্বেচ্ছাসেবক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।’
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবেরের দাবি, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমাতে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হচ্ছে গুরুত্ব। এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ক্যাম্পে বসবাসকারী শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি। তাই জ্বর বা অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। ক্যাম্পে ডেঙ্গুতে ছয় শিশুর মৃত্যু এ ঝুঁকির গুরুতর দিকটি সামনে এনেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।



