লক্ষ্মীপুরের সত্যনারায়ন
রসগোল্লা নয়, রসের গোলা

ছবিঃ আগামীর সময়
গামলায় গরম সিরার মধ্যে ডুবিয়ে রাখা রসগোল্লা। সচরাচর যেসব রসগোল্লা পাওয়া যায়, আকারে তার চেয়ে দুইগুণ বড়। গরুর দুধের ছানার ঘ্রাণেই যেন অর্ধভোজন সারা! প্লেটে নিয়ে চামচ কেটে মুখে দিয়েই বুজে গেল দুই চোখ। আহা! সেই কী স্বাদ। মনে মনে আওড়াতে থাকি সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘রসগোল্লা’ গল্পের সেই বিখ্যাত ছত্র, ‘রসের গোলক, এত রস তুমি কেন ধরেছিলে হায়।’
শুধু বিখ্যাত লেখকের গল্পের লাইন নয়, নিজের ভেতরের সত্ত্বাও জেগে উঠেছে প্রাণময় গতিতে। ‘রসগোল্লা নয়, যেন রসের ভেতর ডুবে থাকা গোলা। ১৫০ বর্গফুটের ছোট্ট একটি দোকানের এত সগৌরব মহিমা কামানের গোলাকেও হার মানায়।’
এই রসগোল্লার স্বাদ নিতে যেতে হবে লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের কেন্দ্রস্থল থানা রোডে; বাজারের ভেতর সত্যনারায়ন মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। শহরজুড়ে নামেই খ্যাত দোকানটি। চারটি টেবিল, দুটি শো-কেস আর সামনে ক্যাশবাক্স নিয়ে ছোট্ট দোকান। বাজারের ভেতরেই মিষ্টি তৈরির কারখানা।
শুরুটা যেভাবে
প্রায় ৬০ বছর আগে শহরের বাসিন্দা ক্ষেত্রমোহন সাহা ও তার ছেলে কার্ত্তিক চন্দ্র সাহা মিষ্টির দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাবা-ছেলে বিদায় নিয়েছেন। দুজনই পরপারে। কার্ত্তিকের সন্তানরাও অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত। তেমন একটা দোকানমুখী হন না। ক্ষেত্রমোহনের মেয়ের ঘরের নাতি মিন্টু সাহার ওপরই এখন সব দায়িত্ব।
রসগোল্লা দিয়ে খ্যাতি ছড়ালেও সত্যনারায়ণে আরও মেলে লালমোহন, ছানার সন্দেশ, ক্ষীরভোগ, চমচম, ছানার আমিত্তি, দই, ক্ষীরের দই, রসমলাই এবং টাটকা ঘি। প্রতিকেজি রসগোল্লার দাম ৩৫০, ক্ষীরভোগ ৬০০, সন্দেশ ৪৮০ টাকা। ঘি বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১৮০০ টাকায়। আর পিস হিসেবে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা প্রতিটি রসগোল্লা।
সকালে এবং সন্ধ্যার আগে দুইবার গরম মিষ্টি নামানো হয় বলে জানালেন মিন্টু সাহা, ‘দোকানে বিক্রির জন্য রসগোল্লা, সন্দেশ, ক্ষীরভোগ, আমিত্তি দুইবার নামায়। এগুলো বেশি বিক্রি হয়। সবচেয়ে বেশি চাহিদা রসগোল্লার।’
রসগোল্লার রহস্য
কারখানায় মিষ্টি তৈরির কলাকৌশল যাতে ফাঁস না হয়, খুব সতর্ক মিন্টু। ‘১৫-১৬ জন দক্ষ কারিগর আছেন। আমাদের এখানে কয়েকটি পরিবার আছে জেনারেশনের পর জেনারেশন মিষ্টি তৈরির কাজই করছে। কয়েকজন আছে, যাদের বাপ-দাদারাও আমাদের কারখানায় কাজ করে গেছে।’
এমন স্বাদের রসগোল্লার রহস্য কী, হেসে জবাব দেন তিনি। ‘গরুর খাঁটি দুধ। সেই দুধ থেকে তোলা সদ্য ছানা। শুধু ছানা দিয়েই হয় আইটেমগুলো। চিনি ব্যবহার করা হয় কম। ছানার স্বাদটা যেন অটুট থাকে, সেই চেষ্টা করি।’
পূজাপার্বণ, ঈদ, নববর্ষ কিংবা যে কোনো সামাজিক উৎসবের জন্য প্রায় প্রতিদিনই মিষ্টির অর্ডার থাকে। দিনের বিক্রি এবং অর্ডার মিলিয়ে গড়ে প্রতিদিন অন্তত ৫০ মণ দুধ লাগে।
লক্ষ্মীপুরের ব্র্যান্ড
দোকানে ঢুকে চেয়ার খালি পাওয়া দুষ্কর। মিষ্টি ছাড়াও দোকানে মেলে কম তেলে ভাজা পরোটা, সবজি, গরম কচুরি।
পরোটা-সবজি আর এক পিস রসগোল্লা খেয়ে একটি ওষুধ কোম্পানির বিপণন কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া, ‘আমি লক্ষ্মীপুরের কেউ না। বাইরের ডিস্ট্রিক্ট থেকে এখানে চাকরি করতে এসেছি। আমি প্রত্যেকদিন সকালে এখানে নাস্তা করি। প্রত্যেকটা আইটেম তারা এত যত্ন করে বানায়, খুবই সুস্বাদু। খেয়ে অস্বস্ত্বিতে পড়তে হয় না।’
ছয় দশকের ব্যবধানে সত্যনারায়ন মিষ্টান্নভাণ্ডার এখন লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে, বললেন অধিবাসী ব্যবসায়ী শিমুল। ‘সত্যনারায়নের রসগোল্লার স্বাদ একবার যে খেয়েছে সে ভুলতে পারবে না। আমাদের জেলায় তো বটেই, আশপাশের এলাকা থেকেও লোকজন এলে একবার সত্যনারায়নে ঢোকে। এটা আমাদের জেলার ব্র্যান্ড।’















