সংকটের সুযোগে সক্রিয় প্রতারক চক্র
পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ফেসবুকে তেল বিক্রির নামে প্রতারণা

ছবিঃ আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় যখন দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র, ঠিক তখনই বিপাকে পড়া সাধারণ মানুষের দুরবস্থাকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এক নতুন প্রতারণা চক্র। পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের হতাশা আর অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে ফেসবুকে ছড়ানো হচ্ছে লোভনীয় অফার- কখনো কম দামে, কখনো দ্রুত সরবরাহের আশ্বাসে। কিন্তু এই প্রলোভনের আড়ালে লুকিয়ে আছে সুপরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদ, যেখানে লক্ষ্য একটাই- ক্রেতার টাকা হাতিয়ে নেওয়া।
সক্রিয় প্রতারক চক্র
এই সংকটকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রতারক চক্র। বিভিন্ন পেজ থেকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি কিংবা অস্বাভাবিক কম দামে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন বিক্রির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। আকর্ষণীয় অফার, সীমিত সময়ের ঘোষণা এবং হোম ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা চলছে।
অনুসন্ধানে অন্তত ১৩টি ফেসবুক পেজের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলো গত ৩০ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিলের মধ্যে এ ধরনের পোস্ট করেছে। এসব পোস্টে জ্বালানি তেলের বিভিন্ন মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে, তাদের মজুদকৃত তেলের কোনো সরকারি অনুমোদন নেই- এমনকি ক্রেতাদের নথি গোপন রাখার কথাও বলা হচ্ছে।
ফেসবুকে “খান ট্রেডার্স” নামের একটি পেজের পোস্টে লেখা হয়েছে, “খান ট্রেডরসে পাচ্ছেন সীমিত সময়ের জন্য মজুদকৃত ডিজেল অকটেন, পেট্রোল, এবং সয়াবিন, সরিষার তেল।” এরপর, ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, সয়াবিন ও সরিষার তেলের লিটারপ্রতি দাম উল্লেখ করা হয় যথাক্রমে ১৩০, ১৫০, ১৫০, ১৪০ ও ১৬০ টাকা।
পোস্টে আরও বলা হয়, যেকোনো পণ্য ১০ লিটারের নিচে বিক্রি হয় না এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার ভিতর সারা বাংলাদেশ হোম ডেলিভারি করে দেওয়া যাবে। এছাড়া সেখানে জানানো হয়, তাদের মজুদকৃত সকল ধরনের তেল সরকারের অনুমোদন ছাড়া। তাই এই বিষয়ে সকল ডকুমেন্ট ক্রেতার কাছে রাখতে হবে এবং সেটা প্রকাশ করা যাবে না।
আবার “যমুনা তেল পাম্প” নামের একটি পেজ থেকেও গত ১ এপ্রিল জ্বালানি তেল বিক্রি করা একটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনের এক অংশে বলা হয়, “যমুনা তেল পাম্প নিয়ে এলো পেট্রোল ও অকটেন ১:পেট্রোল প্রতি লিটার১৪০ ২:অকটেন প্রতি লিটার ১৫০ ৩:ডিজেল প্রতি লিটার ১২০ ৪:কেরোসিন প্রতি লিটার ১০০ বিশেষ দ্রষ্টব্য সম্পূর্ণ ক্যাশ অন ডেলিভারিতে মাল দেওয়া হয় না অর্ডার করলেই ডেলিভারি চার্জ সম্পূর্ণ ফ্রি সম্পূর্ণ ক্যাশন অন ডেলিভারি প্রযোজ্য নয় আপনাকে ২০% টাকা এডভান্স করতে হবে বাকি ৮০% টাকা ডেলিভারি মেনকে পরিশোধ করতে হবে।” যোগাযোগের জন্য একটি নম্বরও দেওয়া হয় পোস্টে। এ নিয়ে মেটায় বিজ্ঞাপনও চালিয়েছে পেজটি।
শুধু পোস্টেই নয়, এসব পেজের অনেকগুলো থেকেই বিজ্ঞাপন আকারে তেল বিক্রির প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ১৩টি পেজের মধ্যে অন্তত ১০টি পেজ বিজ্ঞাপন চালিয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।“খান ট্রেডার্স” ও “যমুনা তেল পাম্প” নামের পেজসহ আরও কয়েকটি পেজে তেলের মূল্য সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার শর্তও দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে “মেঘনা ডিপো” ও “পদ্মা এন্টারপ্রাইজ” নামের পেজগুলোতে আবার স্বাভাবিকের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রির দাবি করা হচ্ছে- প্রতারণার আরেকটি কৌশল।সরকারি হিসাবে, এপ্রিল মাসে ডিজেল প্রতি লিটার ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ এসব পেজে এই দামের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দেওয়া হচ্ছে।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৩টি পেজের মধ্যে ৯টিই খুব সম্প্রতি, অর্থাৎ ২৭ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিলের মধ্যে খোলা হয়েছে। পুরোনো কয়েকটি পেজও নাম পরিবর্তন করে নতুন পরিচয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, পরিকল্পিতভাবে ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা চালানো হচ্ছে।মেটার নীতিমালা অনুযায়ী, দাহ্য ও বিপজ্জনক পদার্থের বাণিজ্যিক প্রচারণা বা বিক্রয় নিষিদ্ধ। অথচ ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের মতো জ্বালানি তেল এসব পেজে প্রকাশ্যে বিক্রি ও বিজ্ঞাপন করা হচ্ছে, যা সরাসরি নীতিমালা লঙ্ঘন।















