চট্টগ্রাম
পান্তা-ইলিশকে হটিয়ে বৈশাখের টেবিলে বিরিয়ানির রাজত্ব

সংগৃহীত ছবি
বাংলা নববর্ষ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। আর এই উৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে খাবারের ঐতিহ্য। একসময় পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তা ভাত, কাঁচামরিচ আর লবণের সহজ আয়োজনই ছিল গ্রামবাংলার মানুষের প্রধান ভরসা। সময়ের পরিক্রমায় সেই পান্তা ভাতের সঙ্গেই যুক্ত হয় ইলিশ মাছ, গড়ে ওঠে পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য।
এই ঐতিহ্যের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় মোগল আমলে। পনেরো শতকের মধ্যভাগে মোগল সম্রাট আকবর প্রচলন করেন ‘ফসলি সন’। কালক্রমে যা রূপ পেয়েছে বাংলা বর্ষে। ফসলি সনের শুরুর দিনে বাংলার জমিদারেরা কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে প্রজাদের করাতেন মিষ্টিমুখ।
মোঘল আমলে পান্তা ভাত আর কাঁচামরিচ খেয়ে ভোরে মাঠে ছুটতেন কৃষক। সেই পান্তা ভাতই পরে ফসলি সনের শুরুতে সামাজিক উৎসবের অংশ হয়ে ওঠে। শত বছরের ব্যবধানে বাঙালি কৃষক ভাতের সঙ্গে ঝোল তরকারি পাতে নেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করে। তখন পান্তা ভাতের সঙ্গে যোগ হয় মাছও। তবে ইলিশ যে কখন বাংলা বর্ষের প্রথমদিন উদযাপনে পান্তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা ইতিহাসে মেলেনি।
এখন পান্তা-ইলিশ পহেলা বৈশাখের জনপ্রিয় আয়োজন। তবে বৈশাখে ইলিশের মৌসুম নয়, তাই দামও অনেক বেশি। ফলে ইলিশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়, এটি বেশি দেখা যায় অভিজাতদের টেবিল বা বড় রেস্তোঁরায়।
বন্দরনগরীর অভিজাত হোটেল-রেস্তোঁরাগুলো পহেলা বৈশাখে ইলিশসহ নানা মাছ, ভাজি-ভর্তা, বিরিয়ানি ও মেজবানি মাংস দিয়ে আয়োজন সাজায়। ব্যতিক্রম হবে না এবারও।
তবে বিভিন্ন রেস্তোঁরার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মুখে মুখে জনপ্রিয় হলেও চট্টগ্রামে খাবার টেবিলে পান্তা-ইলিশকে হটিয়ে দেয় ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি কিংবা মেজবানি মাংস।
হোটেল রেডিসন ব্লু বে ভিউ
চট্টগ্রামের একমাত্র পাঁচতারা হোটেল রেডিসন। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ১৪ ও ১৫ এপ্রিল দুইদিনের আনন্দঘন আয়োজন করা হয়েছে এ হোটেলে।
রেডিসনের জনসংযোগ ও বিপণন যোগাযোগ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক ওয়াসিক জাওয়াদের সঙ্গে কথা হয়। জানালেন, বৈশাখে বিশেষ ভোজ উৎসবের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হবে। হোটেলের লেভেল-থ্রিতে এক্সচেঞ্জ রেস্টুরেন্টে ১৪ এপ্রিল বিশেষ বৈশাখী ভোজ উৎসব হবে। সেখানে ভাজি, ভর্তা, ইলিশসহ বিভিন্ন পদের মাছ, মাংস, ডেজার্ট, জুস মিলিয়ে শতাধিক আইটেমের বুফে লাঞ্চ ও ডিনার থাকছে।’
‘হোটেলের লবিতে চলবে বৈশাখী মেলা ও বাউল গান। পরদিনও একইভাবে ভোজ উৎসব এবং বৈশাখী কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে।’ - যোগ করেন তিনি।
অতিথিদের জন্য আছে দুই ধরনের অফার। নির্দিষ্ট ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে ব্যুফে লাঞ্চ ও ডিনারে ‘একের দামে তিন’ এবং ‘একের দামে চার’ অফার উপভোগ করতে পারবেন। এছাড়া বৈশাখী মেলায় অংশ নেওয়া গ্রাহকদের জন্য ৬৫০, ৭০০ এবং ৭৫০ টাকার বিশেষ ফুড প্ল্যাটার রাখা হচ্ছে, যা উৎসবের প্রবেশ মূল্য হিসেবে গণ্য হবে।
হোটেল পেনিনসুলা
বন্দরনগরীর আরেকটি অভিজাত হোটেল দ্য পেনিনসুলা। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ১১ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত তাদের সেন্ট ক্যাফেতে আয়োজন করা হয়েছে বৈশাখী পিঠা উৎসবের। ১৩ এপ্রিল বুফে ডিনার। ১৪ এপ্রিল ২৩৯৯ টাকার বুফে লাঞ্চ। আর সাড়ে ৩ হাজার টাকার ডিনারের সময় থাকছে লাইভ পারফরম্যান্স। একইভাবে পরদিনও বুফে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে।
পেনিনসুলা হোটেলের ব্যবস্থাপক (সেলস এন্ড মার্কেটিং) কামাল হোসেন শতাধিক আইটেমের বুফে ছাড়াও বৈশাখী প্লেটার থাকছে। জানালেন, এই প্লেটারে নানা পদের ভর্তা, ডিপ ফ্রাইড ইলিশ ও গোলাপজাম থাকবে। এই প্যাকেজের দাম দুই হাজার টাকা।
রোদেলা বিকেল
কোয়ালিটি ফুড আর টেস্ট। বৈচিত্র্যের ব্র্যান্ড স্টেডিয়াম পাড়ার রোদেলা বিকেল। বাঙালির মাছ-ভাত, হরেক পদের ভর্তা, পেশোয়ারি মাটন কিংবা গরুর গোশতের কালা ভুনা। মুখরোচক এমন নানা আইটেমের সমাহার ঘটিয়ে এবারও পহেলা বৈশাখের আয়োজন করে ভোজনরসিকদের আবাহন করছে রোদেলা বিকেল।
মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শামসুদ্দিন জানালেন কেন তাদের রেস্তোঁরার বিশেষ আয়োজনগুলো অনন্য হয়ে ওঠে, ‘আমরা যাচাইবাছাই ছাড়া সচরাচর বাজার থেকে মাছ-মাংস, সবজি কিনে এনে বিক্রি করি না। যেমন- কাপ্তাই লেকের কাতলা, বোয়াল, চিতল স্বাদে সেরা। আমরা সেই মাছই সংগ্রহ করি।’
পদ্মার দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের ইলিশ দিয়ে এবারের বৈশাখের আয়োজন জানিয়ে ফ্লোর ম্যানেজার শিবু পাল বললেন, ‘ভাজি, সরিষা ইলিশ ও ইলিশের চচ্চরি এ তিন পদই থাকবে। থাকবে খিচুড়ি ও সাদা ভাত।’
বারকোড ও বীর চট্টলা
অভিজাত বারকোড ও বীর চট্টলা রেস্তোঁরা। বারকোড দেশি-বিদেশি নানা আইটেমের জন্য গ্রাহকের পছন্দের শীর্ষে। আর বীর চট্টলা বাঙালি খাবারের জন্য।
বারকোডে এবার বিশেষ কোনো আয়োজন করা হয়নি। তবে নগরীর জামালখানের বীর চট্টলায় বড় আয়োজন থাকছে জানিয়ে উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মঞ্জুরুল হক বললেন, ‘বারকোডে আমাদের সচরাচর যেসব আইটেম থাকে, সেগুলো বিক্রি হবে। পহেলা বৈশাখে সেগুলোর চাহিদাও কম নয়। বীর চট্টলায় ভাজি, ভর্তা, ইলিশ, বিরিয়ানি সব থাকবে। ভাজি, ভর্তা আর বিরিয়ানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।’
বাস্তবতা হলো, পহেলা বৈশাখে ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পান্তা-ইলিশ এখনও বাঙালির সংস্কৃতিতে জায়গা ধরে রেখেছে। তবে বাস্তব ভোজন সংস্কৃতিতে তার অবস্থান অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিকতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৈশাখের খাবারের টেবিলেও এসেছে নতুন ধারা। পান্তা-ইলিশ তাই এখন আর একচ্ছত্র নয়, বৈশাখের টেবিলে রাজত্ব করছে ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি।















