পানিতে তলিয়ে থাকার ২৫ বছর পর জেগে উঠল যে আর্জেন্টাইন শহর

দুই দশকেরও বেশি সময় পানির নিচে থাকার পর বন্যার পানি সরে গেলে আর্জেন্টিনার এপেকুয়েন শহরে ভিড় করেছেন পর্যটকেরা। ছবি : রয়টার্স
একসময় পর্যটকদের পদচারণায় মুখর ছিল শহরটি। ছিল হোটেল, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর লেকের পাশে অবকাশ যাপনের নানা আয়োজন। গ্রীষ্মের মৌসুমে হাজার হাজার পর্যটকের ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠত পুরো এলাকা।
কিন্তু কয়েক বছরের অতিবৃষ্টিতে সেই ব্যস্ত শহরই একসময় তলিয়ে যায় পানির নিচে। প্রায় ২৫ বছর পর খরার কারণে পানি সরে গেলে ধীরে ধীরে আবারও দৃশ্যমান হয় শহরটির ধ্বংসাবশেষ।
আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় পর্যটন শহর ভিলা এপেকুয়েনের গল্প যেন বাস্তবের কোনো হারানো নগরীর কাহিনি। দেশটির রাজধানী বুয়েনস আয়ার্স থেকে প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত এই শহর একসময় আর্জেন্টিনার অন্যতম পরিচিত স্পা নগরী ছিল।
ভিলা এপেকুয়েনের পাশের লেক এপেকুয়েনের পানিতে লবণের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত বেশি। এই পানিতে গোসল করলে নানা ধরনের শারীরিক উপকার পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করতেন অনেকে। এ কারণে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শহরটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
লেকটির ইতিহাসও বেশ পুরনো। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ শতকের শুরুর দিকে লেকের মূল্যবান খনিজ সংগ্রহ করে কাচ উৎপাদন ও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হতো।
এ ছাড়া লবণাক্ততার কারণে লেকটিকে বিশ্বের অন্যতম লবণাক্ত জলাধার হিসেবেও বিবেচনা করা হতো। এমনকি একসময় এটিকে ডেড সির সঙ্গেও তুলনা করা হতো।
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সত্তরের দশকে ভিলা এপেকুয়েনে প্রায় ৫ হাজার মানুষ বসবাস করতেন। ছিল প্রায় ৩০০ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। গ্রীষ্মের মৌসুমে শহরটিতে পর্যটকের সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত পৌঁছে যেত। পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল লেকের লবণাক্ত পানি।
তবে আশির দশকে পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৯৮০ সালের পর থেকে ওই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে থাকে। ১৯৭৮ সালে শহরকে বন্যার পানি থেকে রক্ষার জন্য একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৫ সালের ১০ নভেম্বর প্রবল বৃষ্টির চাপে সেই বাঁধ ভেঙে যায়।
এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে লেকের পানি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানির উচ্চতা ঘণ্টায় প্রায় এক সেন্টিমিটার করে বাড়ছিল। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে শহরের কিছু অংশ প্রায় তিন মিটার পানির নিচে চলে যায়। বাধ্য হয়ে বাসিন্দাদের শহর ছাড়তে হয়।
বন্যার পানি ক্রমেই বাড়তে থাকে। ১৯৯৩ সালের মধ্যে ভিলা এপেকুয়েন প্রায় ১০ মিটার পানির নিচে চলে যায়। একসময় যে শহরে হাজার হাজার পর্যটক আসতেন, সেটিই পরিণত হয় পানির নিচে হারিয়ে যাওয়া এক নগরীতে।
এরপর প্রায় ২৫ বছর শহরটির কোনো অস্তিত্বই চোখে পড়েনি। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে লেকের পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। পরে ২০০৯ সালের দিকে পানির স্তর এতটাই নেমে যায় যে ভিলা এপেকুয়েনের ধ্বংসাবশেষ আবার দৃশ্যমান হতে থাকে।
পানি সরে যাওয়ার পর যে দৃশ্য সামনে আসে, তা ছিল একেবারেই ভিন্ন। দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকার কারণে ভবনগুলো ভেঙে পড়েছে। লেকের অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ভবন, গাছপালা ও অন্যান্য কাঠামোর ওপর সাদা লবণের আস্তরণ তৈরি করেছে।
কোথাও পড়ে আছে পুরনো দেয়াল, কোথাও ভেঙে যাওয়া ভবন, আবার কোথাও দাঁড়িয়ে আছে লবণে ঢেকে যাওয়া গাছ।
বর্তমানে ভিলা এপেকুয়েন মূলত একটি পরিত্যক্ত শহর। তবে এর ধ্বংসাবশেষ দেখতে পর্যটকরা সেখানে যান। শহরটির ইতিহাস সংরক্ষণে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
পুরনো রেলস্টেশনকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে শহরের অতীতের বিভিন্ন স্মারক ও উদ্ধার করা সামগ্রী রাখা হয়েছে।
শহরটির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে পাবলো নোভাকের নাম। ভয়াবহ বন্যার সময় শহর ছেড়ে যেতে হলেও তিনি পরবর্তী সময়ে আবার ভিলা এপেকুয়েনের কাছে ফিরে আসেন।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি ধ্বংসাবশেষের কাছাকাছি বসবাস করেছেন এবং আগ্রহী দর্শনার্থীদের শহরের ইতিহাস জানিয়েছেন।
একসময় পানির নিচে হারিয়ে যাওয়া ভিলা এপেকুয়েন এখন পর্যটকদের কাছে এক ভিন্ন আকর্ষণ। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা লবণে ঢাকা ভবন ও গাছপালা মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষের পরিকল্পনা কতটা অসহায় হতে পারে।
প্রায় ২৫ বছর পানির নিচে থাকার পর জেগে ওঠা এই শহর তাই আজ আর্জেন্টিনার এক অনন্য ঐতিহাসিক ও পর্যটন নিদর্শন।
সূত্র : ইকোনমিক টাইমস






