যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে জল্পনার পর কড়া বার্তা লন্ডনের
ফকল্যান্ড ব্রিটেনেরই থাকবে

সংগৃহীত ছবি
দক্ষিণ আটলান্টিকের বিতর্কিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে কোনও সমঝোতা নয়, ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের অবস্থান বদলাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, এমন খবর প্রকাশ্যে আসার পর শনিবার (২৯ আগস্ট) লন্ডন জানিয়েছে, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ‘ব্রিটিশ বৈদেশিক অঞ্চল হিসেবেই থাকবে’ এবং সেখানকার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র শনিবার জানিয়েছেন, ফকল্যান্ড নিয়ে লন্ডনের অবস্থান দীর্ঘদিনের এবং অপরিবর্তিত। তার বক্তব্য, দ্বীপবাসীরা বারবার ব্রিটিশ বৈদেশিক অঞ্চল হিসেবে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং সেই ইচ্ছাকে সম্মান করবে ব্রিটেন।
এই মন্তব্য এল এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনার খবর সামনে এসেছে। অভিযোগ, ব্রিটেন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারে আরও সহযোগিতা না করলে ওয়াশিংটন চাপ তৈরির জন্য ফকল্যান্ড প্রশ্ন ব্যবহার করতে পারে।
ফকল্যান্ড নিয়ে কেন এত বিতর্ক?
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত। ব্রিটেন বর্তমানে দ্বীপগুলোর প্রশাসন পরিচালনা করে এবং এগুলোকে নিজেদের বৈদেশিক অঞ্চল হিসেবে দেখে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপগুলোর উপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে এবং স্থানীয়ভাবে এগুলোকে ‘মালভিনাস’ নামে ডাকে।
১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে প্রায় ৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনী দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে।
বর্তমানে ব্রিটেনের যুক্তি, দ্বীপবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই চূড়ান্ত বিষয়। ২০১৩ সালে আয়োজিত গণভোটে ৯৯.৮ শতাংশ ভোটার ব্রিটিশ বৈদেশিক অঞ্চল হিসেবেই থাকার পক্ষে মত দেন।
আমেরিকার অবস্থান নিয়ে কেন প্রশ্ন?
যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ফকল্যান্ড প্রশ্নে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বভৌমত্বের দাবিতে কোনও পক্ষ নেয় না, তবে বর্তমানে ব্রিটিশ প্রশাসনকে স্বীকৃতি দেয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মধ্যে ফকল্যান্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওয়াশিংটনের একাংশ মনে করছে, ইউরোপীয় মিত্রদের আরও বেশি সামরিক খরচ বহন করা উচিত। সেই চাপ তৈরির সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে ফকল্যান্ড প্রশ্ন ব্যবহারের আলোচনা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়।
বিশেষ করে ব্রিটেন ন্যাটোর অন্যতম বড় সামরিক শক্তি হলেও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিক, এমন চাপ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে।
লন্ডনের বার্তা: ন্যাটোতেও ভূমিকা রাখছে ব্রিটেন
ফকল্যান্ড নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি ব্রিটিশ সরকার নিজেদের প্রতিরক্ষা ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, ব্রিটেন ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং ইউরোপের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্রিটেন বর্তমানে ন্যাটোর তৃতীয় বৃহত্তম আর্থিক অবদানকারী এবং ইউরোপের মধ্যে একমাত্র দেশ, যারা নিজেদের পরমাণু প্রতিরোধ ক্ষমতা ন্যাটোর প্রতিরক্ষায় যুক্ত করেছে।
আর্জেন্টিনার নজরও ফকল্যান্ডে
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক শুরু হতেই আর্জেন্টিনা বিষয়টিতে ফের সক্রিয় হয়েছে। বুয়েনস আইরেস দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ফকল্যান্ড তাদের ঐতিহাসিক ভূখণ্ড। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সরকারও কূটনৈতিক পথে দ্বীপগুলোর দাবি তুলে আসছে। তবে ব্রিটেন বলেছে, সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনও আলোচনা দ্বীপবাসীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে হবে না।
বিশেষ সম্পর্কে নতুন চাপ
ফকল্যান্ড বিতর্ক শুধু একটি দ্বীপের প্রশ্ন নয়, এটি ব্রিটেন-আমেরিকার দীর্ঘদিনের ‘বিশেষ সম্পর্ক’-এর মধ্যেও নতুন চাপ তৈরি করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্র হলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘বোঝা ভাগাভাগি’ নীতি সেই সম্পর্কের নতুন পরীক্ষা নিচ্ছে।
তবে ব্রিটিশ সরকারের বার্তা স্পষ্ট, প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে, মিত্রদের সঙ্গে মতপার্থক্যও থাকতে পারে; কিন্তু ফকল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে দ্বীপবাসীর ইচ্ছা, কোনও বিদেশি চাপ নয়।
দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট এই দ্বীপপুঞ্জ তাই আবারও বড় শক্তির কূটনৈতিক টানাপড়েনের কেন্দ্রে। একদিকে আমেরিকার প্রতিরক্ষা চাপ, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার পুরনো দাবি আর মাঝখানে ব্রিটেনের অটল বার্তা, ‘ফকল্যান্ড ব্রিটেনেরই থাকবে’।







