"তোমার মতের সঙ্গে একমত নই, তবুও তোমার বাকস্বাধীনতায় জীবন দেব"- ট্রাম্পকে যেন সেই বার্তাই দিল আদালত!

ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ফিলিস্তিনপন্থী মত প্রকাশ কিংবা ইসরায়েল-সমালোচনার অভিযোগে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিল ও বহিষ্কারের ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে এবার আদালতের সরাসরি বাধা। ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসেতে ফেডারেল বিচারক নোয়েল ওয়াইজ প্রশাসনের এই কৌশলকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন।
এ রায়ের মধ্য দিয়ে যেন আবারও সামনে এলো আমেরিকান গণতন্ত্রের সেই ঐতিহাসিক দর্শন—‘তোমার মতের সঙ্গে আমার মতের মিল নাও থাকতে পারে, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আমি জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত।’
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬, ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে অবস্থিত ফেডারেল জেলা আদালতে দেওয়া এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিকে নতুন আইনি পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, গবেষক ও অন্যান্য বিদেশি নাগরিকের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার নিয়েও তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নজির।
ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ফিলিস্তিনপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের বিরুদ্ধে ভিসা বাতিল, গ্রেপ্তার এবং বহিষ্কারের পদক্ষেপ শুরু করে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মাহমুদ খালিলসহ বেশ কয়েকজনের ঘটনা তখন জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সরকারের যুক্তি ছিল, কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিন্তু বিচারক নোয়েল ওয়াইজের রায়ে বলা হয়েছে, এ ধরনের অস্পষ্ট ‘পররাষ্ট্রনীতি’ যুক্তি ব্যবহার করে আইনসম্মত রাজনৈতিক বক্তব্যকে শাস্তির আওতায় আনা যায় না।
বিচারক ওয়াইজের সিদ্ধান্তের মূল বার্তা—যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কোনো অ-নাগরিকের আইনসম্মত রাজনৈতিক মতপ্রকাশকে শুধু সেই মতের কারণে অভিবাসন আইনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা যাবে না।
অর্থাৎ, সরকারের নীতির সঙ্গে আপনার মতের মিল না থাকলেও শুধু ভিন্নমত প্রকাশের কারণে আপনার অভিবাসন অবস্থাকে শাস্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বার্তা
এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে থাকা অ-নাগরিকরাও মতপ্রকাশের সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত নন।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে বিক্ষোভ, রাজনৈতিক বক্তব্য ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিসা হারানো বা বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আদালতের রায় সেই আশঙ্কার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সীমারেখা টেনে দিয়েছে।
মামলার সঙ্গে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংবাদপত্রের বিষয়টিও যুক্ত ছিল। তাদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, অভিবাসন-সংক্রান্ত শাস্তির আশঙ্কা বিদেশি শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে পারে। ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ থেকেও অনেকে পিছিয়ে যেতে পারেন।
আইনজীবী কনর ফিটজপ্যাট্রিক এই সিদ্ধান্তকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বড় বিজয় হিসেবে দেখেছেন। তার যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন আইনি পরীক্ষা
ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অগ্রাধিকার। ভিসা বাতিল, বহিষ্কার এবং অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের নানা উদ্যোগের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদের ভিসা বাতিলের আরও বড় কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে।
পর্যটন বা ব্যবসায়িক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করা ব্যক্তিদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিসা বাতিলের পরিকল্পনাও প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সান জোসের আদালতের রায় ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসন নীতিকেই নতুন আইনি পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
রাষ্ট্রের হাতে অভিবাসন আইন প্রয়োগের ব্যাপক ক্ষমতা থাকতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষমতাও সীমাহীন নয়। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের মতো সাংবিধানিক অধিকারের ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতার ওপর আদালত যে নজরদারি চালাতে পারে, সান জোসের এই সিদ্ধান্ত তারই স্পষ্ট উদাহরণ।







