ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকেই মার্কিন সেনাদের বিনোদনকেন্দ্র থাইল্যান্ড
- ইরানের রণাঙ্গন থেকে পাতায়ার রৌদ্রস্নানে

পূর্ব থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরে পৌঁছেছে ইরান যুদ্ধে ক্লান্ত হাজার হাজার মার্কিন নৌসেনাসহ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। অলংকরণ : ফারজিন
ইরানের রণাঙ্গনের দীর্ঘ সামরিক অভিযান শেষে এবার পাতায়ার রৌদ্রস্নানে মার্কিন নৌসেনারা। ২৮৬ দিন সমুদ্রে কাটানোর পর বুধবার পূর্ব থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরে পৌঁছেছে মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও মেরিন নিয়ে আসা এই রণতরীর পাঁচ দিনের থাইল্যান্ড সফরের মূল কারণ ‘বিশ্রাম ও পুনরুজ্জীবন’। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে নিজেই এ মন্তব্য করেছেন মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ-৩-এর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল রবার্ট ই. লাফরান। বিবিসির প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার পর মার্কিন সেনাদের অবকাশ কাটানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে পাতায়ায়।
লিংকনের সঙ্গে আরও দুটি মার্কিন নৌযান রয়েছে। ২ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধাপে ধাপে জাহাজের সদস্যদের তীরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। ফলে পাতায়ার হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, দোকানপাট ও বিনোদন ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাড়তি আয়ের আশা তৈরি হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি শহরের যৌন ব্যবসা ও রাতের বিনোদন ঘিরে উদ্বেগও বেড়েছে প্রশাসনের। তাই মূল সৈকত ও রাতের বিনোদন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশি নজরদারি শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
পাতায়ার সঙ্গে মার্কিন সেনাদের সম্পর্ক অবশ্য বহু যুগ পুরনো। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থেকেই শহরটি মার্কিন সেনাদের বিশ্রাম ও বিনোদনের অন্যতম একটা গন্তব্যস্থল। একসময়ের শান্ত মৎস্যজীবী জনপদটিতে মার্কিন সেনাদের নিয়মিত যাতায়াত শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে হোটেল, বার, রেস্তোরাঁ ও রাতের বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠে। আর সেই অবকাঠামোর ওপর ভর করেই পরে পাতায়া আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। রয়টার্সও শহরটির পর্যটন বিকাশের সঙ্গে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার মার্কিন সেনাদের উপস্থিতির যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং থাইল্যান্ডের সামরিক সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ১৮৩৩ সালের মৈত্রী ও বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের সূচনা হয়। ১৯৫৪ সালে থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভিত্তিক মিত্রদেশ এবং ২০০৩ সালে প্রধান ন্যাটোবহির্ভূত মিত্রদেশের মর্যাদা পায়। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সামরিক সহযোগিতাও রয়েছে। এর মধ্যে বার্ষিক ‘কোবরা গোল্ড’ মহড়া এবং মার্কিন নৌযানের থাইল্যান্ড সফর উল্লেখযোগ্য।
ফলে এবার সেই পুরনো সম্পর্কের সূত্র ধরেই পাতায়ায় নতুন করে তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক প্রত্যাশা। পাতায়ার মেয়র পরমাসে নগামপিচেসের হিসাবে, প্রতিটি মার্কিন সেনা দিনে এক হাজার থেকে তিন হাজার থাই বাত পর্যন্ত খরচ করতে পারেন। প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের এই সফরের ফলে স্থানীয় ব্যবসায় কয়েক মিলিয়ন বাতের বাড়তি লেনদেন হতে পারে। তবে সবাই একসঙ্গে তীরে নামবেন না। সেনাদের ছুটি ধাপে ধাপে দেওয়া হবে।
আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। প্রথমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হলেও পরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র- ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়। টানা ২৮৬ দিন সমুদ্রে থাকার এই মোতায়েন আধুনিক সময়ের অন্যতম দীর্ঘ নজির হয়ে উঠেছে। সাধারণত মার্কিন নৌবাহিনীর একটি মোতায়েন ছয় থেকে নয় মাসের হয়। তবে যুদ্ধ বা সংঘাতের বিশেষ ক্ষেত্রে সময় বাড়ানো যেতে পারে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল রবার্ট ই. লাফরান বলেছেন, লায়েম চাবাংয়ে পৌঁছনো নাবিক ও মেরিনদের জন্য ‘প্রাপ্য বিশ্রাম ও নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের’ সুযোগ। তার বক্তব্য, এত দীর্ঘ অভিযানে দলটি যে কাজ করেছে, তা সত্যিই ঐতিহাসিক। প্রতিটি সদস্যের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার জন্য তিনি গর্বিত বলেও জানালেন। দীর্ঘ মোতায়েনের প্রভাব নিয়ে অবশ্য উদ্বেগও রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জাহাজে মানসিক চাপ, মনোবল কমে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার পরিস্থিতির অবনতির কথা উঠে এসেছে। আত্মহত্যার চেষ্টার অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব প্রতিবেদনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে যৌন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সেখানকার প্রশাসন। মার্কিন সেনাদের আগমনের আগে সপ্তাহান্তে পুলিশের অভিযানে যৌন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে ৪০-৫০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। পাতায়ার পুলিশপ্রধান আনেক শ্রাথংইয়ু বলেছেন, প্রকাশ্য স্থানেই সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হওয়ায় এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। থাইল্যান্ডে যৌন ব্যবসা বেআইনি হলেও পাতায়ার মতো পর্যটনকেন্দ্রে তা এখনো রয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন সেনাদের জন্য কিছু কার্যকলাপেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি আইন ভঙ্গ, যৌন শোষণ ও অন্যান্য অপরাধ ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে। ফলে ইরানের রণাঙ্গন থেকে ২৮৬ দিনের সমুদ্রযাত্রা শেষে পাতায়ায় এই আগমন শুধু বিশ্রামের নয়— একই সঙ্গে পর্যটন ব্যবসার সম্ভাবনা, দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পর স্বস্তি এবং শহরটির পুরনো পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টারও এক বড় পরীক্ষা।





