বাড়ছে ‘চায়নাম্যাক্সিং’ প্রবণতা
চীনা অভ্যাস আয়ত্বের চেষ্টা, পণ্য নিয়ে উন্মাদনা মার্কিনীদের!
- বৈশ্বিক ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চীনের প্রেসিডেন্টের প্রতি আস্থা

সংগৃহীত ছবি
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যখন প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাস্তব এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন দেশটির নাগরিক, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে ভিন্ন এক প্রবণতা।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে আরও ইতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেছে তারা। একে বলা হচ্ছে, ‘চায়নাম্যাক্সিং’ প্রবণতা। গরম পানি পান, ফলের চা তৈরি, ঐতিহ্যবাহী শারীরিক ব্যায়ামসহ চীনা অভ্যাসগুলো আয়ত্বের চেষ্টা এর অন্যতম।
আরও আছে চীনের তৈরি অ্যাডিডাস ট্যাং জ্যাকেট, লাবুবু নামের ছোট মূর্তি নিয়ে উন্মাদনা। একে দেখা হচ্ছে মার্কিনীদের মধ্যে একটি বিস্তৃত মানসিক পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে।
কয়েক বছর আগের তুলনায় এটি একেবারেই ভিন্ন চিত্র, যখন করোনা মহামারীর সময় যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে গিয়েছিল সাইনোফোবিয়া (অযোক্তিক ভীতি) এবং এশিয়াবিরোধী ঘৃণাজনিত অপরাধ।
কনটেন্ট নির্মাতারা সাধারণ চীনা অভ্যাসগুলো আয়ত্ব করার চেষ্টা করেন, যেমন গরম পানি পান করা, ফলের চা তৈরি করা, ঐতিহ্যবাহী শারীরিক ব্যায়াম করা। ‘চীনা হয়ে ওঠার’ আশায় এগুলো করা শুরু করেন তারা
মঙ্গলবার পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় বাণিজ্য যুদ্ধের পর ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায় আরও। ২০২৩ সালের মধ্যে মাত্র ১৪ শতাংশ আমেরিকান চীনকে দেখত ইতিবাচকভাবে।
এখন সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২৭ শতাংশ হয়েছে— যা মার্কিনীদের মধ্যে একটি বিস্তৃত মানসিক পরিবর্তনের প্রতিফলন, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট এবং তরুণদের মধ্যে। এটি পশ্চিমা সামাজিক মাধ্যমে চীনা সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রতি বাড়তি আগ্রহকেও প্রতিফলিত করে, যেমন সাম্প্রতিককালের ‘চায়নাম্যাক্সিং’ প্রবণতা।
গত বছরের তুলনায় এখন কম মার্কিনী শত্রু বলে মনে করছে চীনকে। যদিও অধিকাংশ মার্কিনী এখনো দেশটিকে দেখে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় প্রতিযোগী হিসেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি ও মার্চে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ৮ হাজার ৫০০-এর বেশি প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর চালানো হয় এই জরিপ।
ফলাফলগুলোতে উঠে এসেছে চীনের কর্তৃত্ববাদী নেতা ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি মনোভাব কিছুটা নরম হওয়া এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রতি সন্দেহ বৃদ্ধি পাওয়ার কথাও।
২০২৩ সালের তুলনায় এখন দ্বিগুণেরও বেশি (১৭ শতাংশ) মার্কিনী বৈশ্বিক ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আস্থা প্রকাশ করেছেন শির প্রতি। অন্যদিকে, চীন সম্পর্কিত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ওপর মানুষের আস্থা কমছে, যা এখন ৩৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি গত বছরের তুলনায় ছয় শতাংশ কম।
এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ট্রাম্প ও শি মে মাসে বেইজিংয়ে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং চীন চেষ্টা করছে নিজেকে একটি স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল বিশ্ব শক্তি হিসেবে তুলে ধরার। এটি ট্রাম্পের প্রায়ই অপ্রত্যাশিত পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে অবস্থান করছে, যেমন— ভারী বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পর্যন্ত।
মঙ্গলবার বেইজিংয়ে গ্রেট হলে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সঙ্গে বৈঠকে শি মন্তব্য করেন, আজকের বিশ্ব বিশৃঙ্খলায় পূর্ণ। কারণ এটি ন্যায়বিচার ও শক্তির মধ্যে সংঘর্ষের মুখোমুখি।
ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় বেশিসংখ্যক রিপাবলিকান মনে করেন, ট্রাম্প চীন সম্পর্কে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন
শির ভাষ্য, একটি দেশ আন্তর্জাতিক আইন ও ব্যবস্থাকে কীভাবে বিবেচনা করে, তা প্রতিফলিত হয় তাদের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি, শৃঙ্খলার ধারণা, মূল্যবোধ এবং দায়িত্ববোধের মাধ্যমে।
কিছু মার্কিনীও পোষণ করেন একই ধরনের মতামত। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা চীন সম্পর্কিত নীতিনির্ধারণে ট্রাম্পের সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করেছেন অন্য দেশের প্রতি তার পররাষ্ট্রনীতির দক্ষতার মতোই। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে— উত্তর কোরিয়া, কিউবা এবং ভেনেজুয়েলাও।
অন্যান্য দেশেও পরিবর্তিত হচ্ছে চীনের প্রতি মনোভাব। গত শরতের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০২১ সালের তুলনায় এখন প্রায় তিনগুণ বেশি কানাডিয়ান চীন সম্পর্কে পোষণ করেন ইতিবাচক ধারণা। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অঞ্চলটি যদি দুটি দেশের মধ্যে একটির সঙ্গে জোট বাঁধতে বাধ্য হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনকে বেছে নেবেন অল্প সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরদাতা।
‘চায়নাম্যাক্সিং’ প্রজন্ম
পিউ-এর ফলাফলগুলো তুলে ধরেছে কিছু রাজনৈতিক ও জনসংখ্যাগত বিভাজনের দিকও। যদিও উভয় দলের উত্তরদাতারা চীনের প্রতি দেখাচ্ছেন উষ্ণতা। এই পরিবর্তন বিশেষভাবে ডেমোক্র্যাট এবং ডেমোক্র্যাটঘেঁষা স্বতন্ত্রদের মধ্যে বেশি স্পষ্ট।
একইভাবে, ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় বেশিসংখ্যক রিপাবলিকান মনে করেন, ট্রাম্প চীন সম্পর্কে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যদিও রিপাবলিকানদের মধ্যে কমেছে এই আস্থা।
এখানে রয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য প্রজন্মগত বিভাজনও। ৫০ বছরের বেশি বয়সী মার্কিনীর মধ্যে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি ইতিবাচক। তাদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি আস্থাও তাদের বয়স্কদের তুলনায় কম।
কেন ‘চীনা হয়ে উঠছেন’ যুক্তরাষ্ট্রের জেন-জিরা
এই মতামতের পরিবর্তন অনলাইনে স্পষ্ট। এ বছরের শুরুতে দেখা যায় ‘চায়নাম্যাক্সিং’ প্রবণতা। যেখানে কনটেন্ট নির্মাতারা সাধারণ চীনা অভ্যাসগুলো আয়ত্ব করার চেষ্টা করেন, যেমন গরম পানি পান করা, ফলের চা তৈরি করা, ঐতিহ্যবাহী শারীরিক ব্যায়াম করা। ‘চীনা হয়ে ওঠার’ আশায় এগুলো করা শুরু করেন তারা।
আরও আছে অ্যাডিডাস ট্যাং জ্যাকেট, যা সাংহাই ফ্যাশন উইকে আত্মপ্রকাশের পর বিশ্ব জুড়ে সৃষ্টি করে কেনাকাটার উন্মাদনা। আছে লাবুবু নিয়ে উন্মাদনা। এটি বাইরের নরম আবরণ এবং ধারালো হাসিমুখের দাঁতযুক্ত চীনে তৈরি একটি ছোট মূর্তি, যা গত বছর বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাহায্য করে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা গড়ে তুলতে।
আরও আছে শাওহংশু বা রেডনোট। এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি চীনা সামাজিক মাধ্যম অ্যাপ। যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য টিকটক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় গত বছর হাজারো মার্কিন ব্যবহারকারী ঝুঁকে পড়েছিলেন এই অ্যাপে।
সম্ভবত প্রথমবারের মতো চীনা ও যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এত বড় সংখ্যায় একত্রিত হয়েছিলেন একটি যৌথ প্ল্যাটফর্মে। চীনের গ্রেট ফায়ারওয়াল (ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) দ্বারা দেশটির নাগরিকদের অনেক সময় ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার করা হয় সীমিত।
বড় সংখ্যায় একত্রিত হওয়ার ঘটনা তৈরি করেছিল দুই দেশের মানুষের জন্য রসিকতা ভাগ করে নেওয়া এবং অনলাইন বন্ধুত্ব গড়ে তোলার একটি বিরল সুযোগ হিসেবে।
এগুলো হয়তো স্বল্পস্থায়ী ইন্টারনেট প্রবণতা। কিন্তু চীনা পণ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এই আন্তরিক গ্রহণযোগ্যতা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল, যখন করোনার সময়ে বেড়ে গিয়েছিল এশিয়াবিরোধী বর্ণবাদ।
মিম এবং ভাইরাল পণ্যের নিচে রয়েছে জনমতের একটি পরিবর্তন, যা রাখে বাস্তব প্রভাব। এটি এমন কিছু যা বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার সময় শির পক্ষে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন

