সরকারের আগ্রাসী ব্যাংক ঋণ
শেষ ৩ মাসেই লক্ষ্য ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা
- বাজেটে পুরো অর্থবছরে নিতে চেয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি

আগামীর সময় গ্রাফিকস
ব্যাংক ব্যবস্থায় আগ্রাসী আকার ধারণ করেছে সরকারের ঋণ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাসে (এপ্রিল-জুন) নতুন ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা, যা অতিক্রম করছে সরকারের পুরো অর্থ বছরের ঋণের সীমা। কেননা, পুরো অর্থ বছরে ব্যাংক ঋণে লক্ষ্য নির্ধারণ করা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি। আর গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মোট ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এসব তথ্য।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার প্রতি বছরই ঠিক করে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা। এবার যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে খরচ বাড়লেও রাজস্ব আয় সেভাবে বাড়েনি। আবার বিদেশি উৎস থেকেও আশানুরূপ ঋণ মিলছে না। ফলে সরকারের ঋণচাহিদা মেটাতে ট্রেজারি বিল, বন্ডে আগ্রাসী কায়দায় নিলাম ঋণ নিচ্ছে। নতুন সরকার গঠনের মাত্র ৪৪ দিনে ঋণ নিয়েছে ৪১ হাজার কোটি টাকা। এভাবে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাবে। এতে উৎপাদন কমবে এবং বেড়ে যেতে পারে মূল্যস্ফীতি, যা বেকারত্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি বন্ড-বিলের তথ্য বলছে, সরকার ট্রেজারি বন্ড-বিলের মাধ্যমে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ৩ মাসে নতুন করে ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তার মধ্যে বিলের মাধ্যমে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা এবং বন্ডের মাধ্যমে নেওয়া হবে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। আর বিলের ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যের ৯১ দিন মেয়াদি ঋণ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, ১৮২ দিনের জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা, এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদের ৩০ হাজার কোটি নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একইভাবে বন্ডের মাধ্যমে ৩৯ হাজার কোটি ঋণের মধ্যে ২ বছর মেয়াদের লক্ষ্য হলো ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ৩ বছর মেয়াদী ১ হাজার ৫০০ কোটি, ৫ বছর মেয়াদী ৯ হাজার ৫০০ কোটি, ১০ বছর মেয়াদী ৯ হাজার ৫০০ কোটি, ১৫ বছর মেয়াদী ৩ হাজার ৫০০ কোটি, এবং ২০ বছর মেয়াদী ঋণের লক্ষ্য ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, তিন মাস বাকি থাকতেই ছাড়িয়ে গেছে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা। নতুন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিশাল লক্ষ্য নির্ধারণ সরকারের ঋণকে আরও উসকে দেবে। এটার মূল কারণ রাজস্ব আদায় না হওয়া এবং ভর্তুকি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। আর ব্যাংকগুলো তো এখন ঝুঁকিমুক্ত ঋণ দিতে চায়। সরকারকে ১০ শতাংশ সুদে ঋণ দিলেও তাদের লাভ। কারণ এখানে ঝুঁকি নাই। আর ব্যক্তি খাতে ১৪ শতাংশ সুদেও এখন তারা ঋণ দিতে চায় না। কারণ ফেরত না আসার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। তবে সংশোধিত বাজেটে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৯৯ হাজার কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত সরকার নিয়েছিল মাত্র ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। আর গত অর্থ বছরের পুরো সময় সরকার ব্যাংক ঋণ নেয় মাত্র ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরের গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকার নিয়েছে এক লাখ ৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণ স্থিতি হয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে নতুন করে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ৩০ মার্চ পর্যন্ত নেওয়া ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করেছে ৩২ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ঋণ স্থিতি বেড়ে হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। আর বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকার ৯ মাসে নিয়েছে ৭৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। এতে ৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকায় ঠেকেছে ঋণ স্থিতি। চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকেও সরকারের ঋণ চাহিদা কম ছিল। গত অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নেওয়ার চেয়ে পরিশোধ বেশি ছিল ৫০৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণের চাপ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে এই খাতে ফিরছে না গতি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের ভাষ্য, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো নয়। তাই এখনই নাও পড়তে পারে বড় চাপ। তবে সরকার যদি ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে অর্থনীতির জন্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পিছিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম ৮ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় শুল্ক-কর আদায় কম হয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। আর গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। এই টাকার মধ্যে ৬৮ হাজার ২২৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা নিয়েছিল ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। আর বাকি ৪০ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা নিয়েছে বিএনপি সরকার।
অপরদিকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি হওয়ায় এই অতিরিক্ত ৩৯ হাজার কোটি টাকার পুরোটা পরিশোধ করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে এ অর্থ ব্যয় করতে চায় না সরকার। তাই আগামী জুন পর্যন্ত ৩১৫ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতি গবেষক হেলাল আহমেদ খানের মত, সংকট মোকাবিলায় সরকারের ঋণ গ্রহণ করা অনেকটাই স্বাভাবিক ঘটনা। তবে কোনোভাবেই যেন দেশ দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের ফাঁদে না পড়ে— এটিই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তবে বর্তমান বাস্তবতায় জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে সরকারকে বিভিন্ন খাত থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাও। ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করা উচিত যাতে আরও শক্তিশালী করা যায় অর্থনৈতিক ভিত্তি।

