বর্ণিল ডানায় প্রশান্তি
দেশে বাজরিগার শিল্পের উত্থান ও সম্ভাবনা

লেখক
অস্ট্রেলিয়ার উষ্ণ মরুভূমি আর ঝোপঝাড় থেকে উড়ে আসা এক ছোট্ট পাখি বাজরিগার—আজ বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। কুকুর ও বিড়ালের পর গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে জনপ্রিয়তার তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা এই পাখির ইতিহাস যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এর পালনের বিবর্তনও বিস্ময়কর।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের কাছে একসময় এটি ছিল প্রকৃতির সহজ উপহার। ১৮০৫ সালে বিজ্ঞানী জর্জ শ প্রথমবারের মতো তার লেখায় পাখিটির শারীরিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তবে বাজরিগারের বিশ্বজয় শুরু হয় ১৮৪০ সালে, যখন বিখ্যাত পাখিবিদ জন গোল্ড এক জোড়া জীবন্ত বাজরিগার ইংল্যান্ডে নিয়ে আসেন। এরপর ১৮৫০-এর দশকে ইউরোপজুড়ে এর বিস্তার ঘটে এবং ১৯ শতকের শেষভাগে মানুষ কৃত্রিম প্রজনন ও বর্ণবৈচিত্র্য (মিউটেশন) তৈরি করতে সক্ষম হয়।
প্রথমদিকে বাজরিগার ছিল ইউরোপের অভিজাত শ্রেণির বিলাসিতার প্রতীক। কিন্তু দ্রুত বংশবৃদ্ধির ক্ষমতার কারণে খুব অল্প সময়েই এটি সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে। প্রকৃতির সবুজ রঙের এই পাখি মানুষের পরিচর্যায় নীল, হলুদ, সাদা, ভায়োলেট, ধূসরসহ অসংখ্য রঙে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে বাজরিগার পালন বিশ্বজুড়ে পরিণত হয়েছে একটি সুসংগঠিত শিল্পে ।
এখন বাজরিগার পালন শুধু খাঁচায় পাখি রাখার শখ নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র। ‘ওয়ার্ল্ড বাজরিগার অর্গানাইজেশন’-এর মতো সংস্থাগুলো প্রদর্শনীর মানদণ্ড নির্ধারণ করে। বিশেষ করে এক্সিবিশন বাজরিগার আজ আভিজাত্য ও প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে পাখির রঙ, পালকের বিন্যাস, ভঙ্গি এবং শারীরিক গঠনের ওপর ভিত্তি করে বিচার করা হয়।
গত এক দশকে বাংলাদেশে বাজরিগার পালন শখের সীমা ছাড়িয়ে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক শিল্পে রূপ নিয়েছে। ২০১০ সালে ‘বাজরিগার সোসাইটি অব বাংলাদেশ’-এর প্রথম প্রদর্শনীর মাধ্যমে যে প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত। ‘ওয়ার্ল্ড বাজরিগার অর্গানাইজেশন’-এর সদস্যপদ অর্জনের মাধ্যমে দেশীয় ব্রিডাররা এখন বিশ্বমানের শো-কোয়ালিটি পাখি উৎপাদনে সক্ষম হচ্ছেন।
এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের সরকারি নিবন্ধন ও স্বীকৃতি এই খাতকে দিয়েছে দৃঢ় ভিত্তি। ফলে শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা এখন উন্নত মানের ও হাই-মিউটেশন বাজরিগার পালনে আগ্রহী হচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে রপ্তানি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। শখ ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়ে বাজরিগার শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
এই শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। যেমন—রপ্তানি নীতিমালা সহজীকরণ, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ হয়; প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; খামার স্থাপনে আগ্রহী তরুণদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা; এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় পরিসরের প্রদর্শনীর আয়োজন, যা পর্যটন ও বিনোদন শিল্পকেও সমৃদ্ধ করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার বুনো পরিবেশ থেকে মানুষের সান্নিধ্যে এসে বাজরিগার আজ বিশ্বজুড়ে এক অনন্য স্থান দখল করেছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীক নয়, বরং আধুনিক জীবনে মানসিক প্রশান্তির একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও পরিচিত। কর্পোরেট জীবনের চাপ কিংবা ব্যক্তিগত একঘেয়েমি দূর করতে বাজরিগারের চঞ্চলতা ও মধুর কূজন কার্যকর থেরাপির মতো কাজ করে।
সঠিক পরিকল্পনা, দিকনির্দেশনা এবং সরকারি সহায়তা পেলে এই ছোট্ট পাখিটি একদিকে যেমন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সহায়ক হতে পারে, তেমনি অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দিতে পারে।
লেখক: ফিনান্সিয়াল প্রফেশনাল, ইন্ডিপেন্ডেন্ট কন্ট্রিবিউটর; ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাজরিগার সোসাইটি অব বাংলাদেশ (বিএসবি); জেনারেল সেক্রেটারি, বাংলাদেশ বার্ডস, এনিমেলস এন্ড একোয়া গিল্ড (বিবিএএজি)

