সংসারেও বড় চাপ
অফিস ছুটি নিয়ে তেলের লাইনে...
- ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও মিলছে না তেল
- কম সরবরাহের অজুহাত পাম্প মালিকদের
- ফুয়েল পাসের সুফল নেই
- সংকট বাড়াচ্ছে প্যানিক বায়িং

ছবিঃ আগামীর সময়
আদনান হোসেন, চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। অফিস রাজধানীর বাংলা মোটর, থাকেন মোহাম্মদপুরে। দায়িত্ব বিপণন বিভাগে হওয়ায় তাকে ছুটোছুটি করতে হয় ঢাকার বিভিন্ন অফিস-প্রতিষ্ঠানে। বাসা থেকে অফিস আসা-যাওয়া ও কাজের সুবিধায় ব্যবহার করেন মোটরসাইকেল। কিন্তু জ্বালানির সংকট তাকে ফেলেছে ভীষণ বিপাকে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে নিয়মিত তেল সংগ্রহ করা হয়ে ওঠে না তার। ফলে কয়েক দিন ধরেই ব্যবহার করতে হচ্ছে রিকশা বা অন্য বাহন। হু হু করে খরচ হচ্ছে টাকা।
এমন পরিস্থিতিতে বুধবার অফিস থেকে আধাবেলা ছুটি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন তেলের লাইনে। পরিবাগের মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ আদনান জানালেন, এর আগেও দুদিন অফিস শেষে দাঁড়ান লাইনে। তবে দেরি হওয়ায় নিতে পারেননি তেল।
বুধবার আদনানের মতো অনেকেই ছিলেন পরিবাগের ওই ফিলিং স্টেশনের লাইনে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেল চালক। তাদের অফিস থেকে ছুটি নেওয়ার বিষয়টি না থাকলেও রাইড শেয়ারিং বাদ দিয়ে ছিলেন তেলের অপেক্ষায়। তবে তারা তেল নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ছিলেন সংশয়ে।
অফিস থেকে ছুটি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাবেন কি না, নিশ্চিত নন আদনান। তার কণ্ঠে সংশয়, ‘সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, এখনো তেলের কোনো নিশ্চয়তা নেই। আজ তেল না পেলে দিনটাই মাটি হবে।' অবশ্য কী হবে সেটা তিনি ছেড়ে দিলেন ভাগ্যের হাতে, ‘এখন দেখি কী হয়, তেল না পাওয়া পর্যন্ত আসলে বলা যাবে না।'
ওই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাইড শেয়ারিং চালক আরিফ হোসেন। তিনি জানালেন, সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। তেল নিতে না পারলে ঘুরবে না মোটরসাইকেলের চাকা, জ্বলবে না বাসার চুলা। কারণ, বাসায় কোনো বাজারও নেই। তেল না থাকায় আগের দুদিন করতে পারেননি রাইড শেয়ার। স্ত্রীর জমানো ১ হাজার টাকা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন লাইনে। তেল পেলে রাইড শেয়ার করে আয় করার পরই হবে বাজার।
অন্যদিকে, কাঙ্ক্ষিত তেল পেয়ে উচ্ছ্বাসও প্রকাশ করেন কয়েকজন চালক। রাকিব হোসেন নামে সংবাদকর্মীর কণ্ঠে স্বস্তির ছোঁয়া, ‘দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও ১ হাজার টাকার তেল পেয়েছি। কয়েক দিন নিশ্চিত।'
নীলক্ষেত এলাকার কিউজি সামদানী অ্যান্ড কোং পাম্পেও একই চিত্র। মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি ছাড়িয়েছে পলাশী মোড়। সেখানে অপেক্ষমাণ প্রাইভেট কারচালক কিবরিয়া জানালেন, সকাল ৮টা থেকে না খেয়ে তেলের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন লাইনে। আধাঘণ্টা পরপর একটু আগালেও শেষ হচ্ছে না লাইন।
তেজগাঁও, আসাদগেট, মতিঝিলসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পাম্পগুলোর অবস্থা একই। শত শত মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি, আর চালকদের মুখে ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ।
চালকদের অভিযোগ, অনেক স্টেশনে ইচ্ছাকৃতভাবে তেল দেওয়া হচ্ছে সীমিত পরিমাণে। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরছেন অনেকেই।
তবে পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অত্যন্ত কম। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় গ্রাহকদের সেবা দিতে হিমশিম অবস্থা তাদের। অনেক ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না তেল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে দেশের বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে জ্বালানি তেলের চাহিদা। এর সঙ্গে ‘প্যানিক বায়িং'- অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা। ফলে সংকট হয়েছে আরও তীব্র। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৬ মার্চ জ্বালানি তেলে রেশনিং প্রক্রিয়া চালু করে সরকার।
জ্বালানি তেল বিতরণে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে গত রবিবার থেকে রাজধানীর সাতটি ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য চালু হয়েছে কিউআর কোডভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ ফুয়েল পাস। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তেল বিতরণের ফলে পাম্পগুলোতে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
অভিযোগ রয়েছে, একই ব্যক্তির একাধিকবার তেল নেওয়ার। এই অনিয়ম ও অপচয় রোধে ফুয়েল পাস সরাসরি যুক্ত থাকবে বিআরটিএর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সঙ্গে, যার ফলে সব যানবাহনের তেলের হিসাব থাকবে স্বচ্ছ। ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা গ্রাহকের কিউআর কোড স্ক্যান করার পর দেখতে পাবেন তার জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের পরিমাণ। ডিজিটাল এন্ট্রি শেষ হওয়ার পরই সরবরাহ হবে জ্বালানি। এতে জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদী বিপিসি।

