মনজুরের বাসায় আড়াই ঘণ্টা কী করছিলেন হাসনাত?

চট্টগ্রাম নগরের সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত চট্টগ্রাম নগরের সাবেক মেয়র ও শিল্পপতি এম মনজুর আলম। এখন তাকেই চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক পদে বসিয়ে চসিক নির্বাচনে মেয়রপ্রার্থী করতে চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘মনজুর সাহেবকে মেয়র পদে নির্বাচন করার প্রস্তাব দিয়েছে এনসিপি। এ বিষয়ে আলোচনা করতে চট্টগ্রামে এসেছিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।’
আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে টানা ১৭ বছর চসিকের কাউন্সিলর ছিলেন মনজুর। ছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ‘শিষ্য’। এক-এগারোর পর সম্পর্কের অবনতি হলে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। দলটির সমর্থন নিয়ে ‘গুরু’ মহিউদ্দিনকে হারিয়ে নির্বাচিত হন মেয়র পদে। পরেরবারও নির্বাচন করেছিলেন বিএনপির হয়ে। হেরে গিয়ে করেন দলত্যাগ।
আবারও ঘনিষ্ঠ হন আওয়ামী লীগে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনে হয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনের সময় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা এক মামলায় আসামির তালিকায় আছে তার নাম।
এমন একজন নেতাকে কেন নগর কমিটির প্রধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে— এমন প্রশ্নে এনসিপির এক নেতার ভাষ্য, ‘একজন ওজনদার মানুষকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে চাই আমরা।’
গতকাল মঙ্গলবার এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ গিয়েছিলেন মনজুরের উত্তর কাট্টলীর বাসায়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে বের হওয়ার পর বাসার সামনে জড়ো হওয়া ছাত্রদল-যুবদলের একদল কর্মীর প্রশ্নের মুখে পড়েন।
তারা মনজুরকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তোপের মুখে ফেলেন হাসনাতকে। এরপরই মূলত মনজুরের ‘এনসিপি কানেকশন’ নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। যদিও গত রমজানে এনসিপির ইফতার মাহফিলে অর্থায়ন করে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।
এনসিপির কমিটি কিংবা মেয়র নির্বাচন নিয়ে হাসনাতের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি বলে দাবি করেছেন মনজুর। ‘সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেছেন হাসনাত। আমি যেন উনাদের একটু দেখি, সহযোগিতা করি, সেই অনুরোধ করেছেন।’ মেয়র নির্বাচন করার ইচ্ছা আছে কি না— এমন প্রশ্নে তার প্রতিক্রিয়া, ‘দেখা যাক, আল্লাহ ভরসা।’
ওইদিন চট্টগ্রামে কোনো সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল না এনসিপির। দলটির মহানগর কমিটির সিনিয়র ২-৩ জন নেতা জানতেন হাসনাতের চট্টগ্রামে আসার তথ্য। এমনকি এ বিষয়ে তথ্য ছিল না প্রশাসনের কাছেও। মনজুরের বাসার সামনের ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর নগর পুলিশ এবং এনসিপির অধিকাংশ নেতাকর্মী জানতে পারেন বিষয়টি।
হাসনাতের সফরের বিষয়টি যথাসম্ভব গোপন রাখতে বলা হয়, জানাচ্ছিলেন এনসিপির চট্টগ্রামের এক সিনিয়র নেতা। তার ভাষ্য, ‘সকালের ফ্লাইটে চট্টগ্রামে আসেন হাসনাত ভাই। ফ্লাইটে ওঠার আগে আমাদের ২-৩ জনকে জানানো হয় বিষয়টি। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে বহদ্দারহাটে আসেন তিনি। এরপর চান্দগাঁও হামিদচরে গিয়ে বৈঠক করেন সিনিয়রদের সঙ্গে। অনির্ধারিত এ বৈঠকে আমি নিজেও ছিলাম না। তবে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল আমার সঙ্গে।’
হাসনাত চট্টগ্রামে আসার বিষয়টি অবহিত না করায় সিএমপির বিশেষ শাখার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজ দপ্তরে ডেকেছেন তিনি।
সিএমপির এক কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘এয়ারপোর্ট দিয়ে এসে সারাদিন এখানে ছিলেন তিনি (হাসনাত)। আমরা কেউ জানতাম না। এসবি থেকে কোনো রিপোর্টও আসেনি। ফেসবুকে আসার পর রাতে জানতে পারি।’
হাসনাত নিজেই ফোন করে বাসায় আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বলে দাবি মনজুরের। তার ভাষ্য, ‘দুপুর ১২টার দিকে আমাকে ফোন করে বাসায় আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন হাসনাত। তিনি আসলেন বিকেল ৩টার দিকে। ছিলেন দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।’
মনজুরকে দুই প্রস্তাব দেওয়ার আগে হাসনাত চট্টগ্রামের এনসিপি নেতাদের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। নিশ্চিত করেছে এক সিনিয়র নেতা। তার দাবি, ‘হাসনাত ভাই জিজ্ঞেস করেছেন মনজুর সাহেবকে মহানগর কমিটির আহ্বায়ক এবং মেয়র পদে প্রার্থী করলে কোনো আপত্তি আছে কি-না। গ্রিন সিগনাল দেই সবাই।’
‘আসলে আর কোনো উপায় নেই আমাদের। আমরা যারা চট্টগ্রামে এনসিপির বিভিন্ন পদে আছি, সবাই তরুণ। আমরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কিছু বললে আনা হয় মবের অভিযোগ। বিএনপির বিরুদ্ধে কিছু বললে বাচ্চা ছেলে বলে হেয় করে। এজন্য আমাদের সামনে দরকার একজন ওজনদার মানুষ,’ যোগ করেন তিনি।
এনসিপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দুই প্রস্তাব নিয়ে দলটির শীর্ষপর্যায় থেকে মনজুরের সঙ্গে আলোচনা চলছে রমজানের আগ থেকেই। বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য ঈদের পর এনসিপিপ্রধান নাহিদ ইসলামের চট্টগ্রামে আসার কথা। এর মধ্যে মোটামুটি চূড়ান্ত চট্টগ্রাম মহানগরের ১৫১ সদস্যের কমিটি। এতে আহ্বায়ক করা হয়েছে মনজুরকে। সদস্যসচিব পদে বর্তমান যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন ও মীর মোহাম্মদ শোয়াইব এবং জাতীয় যুবশক্তি চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক হিসেবে আছেন ইরফাত ইব্রাহিম। তবে কাউকেই চূড়ান্ত করা হয়নি এখনো।
এক সপ্তাহের মধ্যে কমিটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত আছে কেন্দ্রের। এর আগে মনজুরের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য পাঠানো হয় হাসনাতকে।
তবে হাসনাতের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন এনসিপির এক নেতা। তার মন্তব্য, ‘এনসিপির প্রস্তাবে সম্মতি দেননি মনজুর। বিএনপি-আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন সাবেক এ মেয়র! আবার ব্যাংক লোন আছে তার। যদি মেয়র নির্বাচন করে হেরে যান, তাহলে বিএনপি সরকার সেটা নিয়ে হয়রানি করতে পারে, করছেন এমন আশঙ্কাও।’

