কক্সবাজার
একটি খবরের অপেক্ষায় শত পরিবার, উপকূলে কান্নার ঢেউ
- আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি, নিখোঁজ শতাধিক
- ৯ এপ্রিল ট্রলারডুবি, ১৩ এপ্রিল জীবিত উদ্ধার ৯
- প্রশাসনের ভূমিকায় ক্ষোভ সামাজিক সংগঠকদের

দেড় বছরের শিশুকে জড়িয়ে নিখোঁজ মোস্তাকের স্ত্রীর কান্না। ছবি: আগামীর সময়
কেউ শেষবার বলেছিল ‘দোয়া করো’, কেউ আবার নীরবে ছেড়েছিল বাড়ি স্বপ্নের খোঁজে। তারপর থেকেই নিস্তব্ধ ফোন, অনিশ্চয়তায় দিন গোনা আর অশ্রুতে ভেজা প্রতিটি সন্ধ্যা। কক্সবাজার উপকূলে এখন শত পরিবার শুধু একটি খবরের অপেক্ষায়, প্রিয়জন বেঁচে আছে কি না—সেই উত্তর জানার জন্য।
রাত নামলেই টেকনাফের লেঙ্গুর বিল কিংবা পেকুয়ার নতুন ঘোনা গ্রামগুলোতে আর নামে না আগের মতো নীরবতা। বাতাসে ভেসে আসে কান্নার শব্দ। কারও স্বামী, কারও ছেলে, কারও ভাই সবাই যেন হারিয়ে গেছে হাজার কিলোমিটার দূরের আন্দামান সাগরের অন্ধকারে। প্রতিটি ঘর এখন এক একটি অপেক্ষার প্রহর গোনার জায়গা।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লেঙ্গুর বিল এলাকার ২৭ বছর বয়সী মোস্তাক আহমদের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ভারী নীরবতা। তিন বছর আগে বিয়ে করেছিলেন, আছে দেড় বছরের এক শিশু সন্তান। কৃষিকাজে কোনোমতে চলা সংসার ছেড়ে উন্নত জীবনের স্বপ্নে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি। দালালের প্রলোভনে সেই যাত্রাই এখন পরিবারের কাছে এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন।
‘দালালরা প্রথমে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে তা কমিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজারে আনে। কিন্তু টাকা জোগাড়ের আগেই নিখোঁজ হয়ে যান মোস্তাক। শেষবার ফোনে বলেছিলেন শুধু, ‘দোয়া করো’। এরপর আর কোনো খবর নেই।’- কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মোস্তাকের স্ত্রী ইসমত আরা। পাশেই ভাইয়ের ছবি আঁকড়ে ধরে কান্না করেন বোন ছাদেকা।
একই চিত্র পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়ারপাড়া গ্রামেও। বেলাল উদ্দিন পাড়ি জমিয়েছিলেন একই স্বপ্নে। ১২ দিন ধরে তার কোনো খোঁজ নেই। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আয়েশা বেগম দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বিলাপ করেন, ‘সে বেঁচে আছে, না সাগরে ডুবে গেছে—আমি জানি না। এই বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব?’
শুধু এই দুই পরিবার নয়, কক্সবাজার উপকূলের শতাধিক পরিবার এখন একই অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর অপেক্ষার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কেউ থানায় ছুটছেন, কেউ জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কিন্তু কোনো উত্তর নেই—প্রিয়জনেরা কোথায়?
ট্রলারে স্বপ্ন, সাগরে ট্র্যাজেডি
বেঁচে ফেরা কয়েকজনের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই বিভীষিকাময় যাত্রার গল্প। গত ৪ এপ্রিল উখিয়া, ইনানী, টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ছোট নৌকায় করে শত শত মানুষকে তোলা হয় একটি বড় ট্রলারে। ট্রলারটির নাম ‘তানজিনা সুলতানা’।
নারী, শিশু, রোহিঙ্গাসহ প্রায় ২৫০ থেকে ২৮০ জন মানুষ গাদাগাদি করে উঠেছিলেন তাতে। গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু ছয় দিনের মাথায়, ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছেই বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়।
বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা যুবক রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেন, সাগরে ভাসতে দেখে বাণিজ্যিক একটি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করেন।
তার ভাষ্য, ‘ট্রলারে অনেক মানুষ ছিল। দাঁড়ানোর জায়গাও ছিল না। ঝড়ের আঘাতে হঠাৎ ট্রলারটা ডুবে গেল। আমরা সাগরে ভেসে ছিলাম।’
আরেকজন রোহিঙ্গা যুবক ইমরান দুঃখ প্রকাশ করেন, ‘ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই যাত্রা দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’
মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা ৯ জন
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের সঙ্গে কথা হয়। জানালেন, ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করা হয়। একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের উদ্ধার করে ১৩ এপ্রিল কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি ও তিনজন রোহিঙ্গা।
তবে ট্রলারে থাকা মানুষের সঠিক সংখ্যা বা তালিকা না থাকায় নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েই সবচেয়ে বেশি শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মানবপাচারের অদৃশ্য জাল
ভুক্তভোগীদের পরিবারের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এই ঘটনার পেছনে সক্রিয় একটি শক্তিশালী মানবপাচার চক্রের হাত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারের অভিযোগ, শাকের মাঝি, হায়দার আলী, আব্দুল আমিন, সৈয়দ উল্লাহ, মো. ইব্রাহীম, আজিজুল হক, মোস্তাক আহমদ, নুরুল কবির বাদশা, মোহাম্মদ উল্লাহ ও মোজাহের মিয়াসহ বেশ কয়েকজন দালাল দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
রোহিঙ্গা শরণার্থী রফিকসহ স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শহর ও সীমান্ত এলাকার আরও বহু ব্যক্তি এই চক্রে সক্রিয়। উখিয়া, টেকনাফের অন্তত সাতটি রুট দিয়ে নিয়মিত মানুষ পাচার করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার পর বেশির ভাগ দালাল আত্মগোপনে রয়েছে। আর স্থানীয় প্রশাসনের তাদের ধরার কার্যক্রম লক্ষণীয় নয়।
প্রশাসনের পদক্ষেপ ও উদ্বেগ
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা হয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই নৌকাডুবিতে নারী-শিশুসহ অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
তাদের মতে, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয় বরং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, সীমিত সুযোগ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক নির্মম প্রতিফলন।
অপেক্ষার প্রহর উৎসবের দেশে শোকের ছায়া
বাংলাদেশ যখন নববর্ষের উৎসবে মুখর। তখন কক্সবাজার উপকূলে অন্য এক বাস্তবতা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজার পৌরসভার সমিতা পাড়ার মো. ইব্রাহিম ৪ এপ্রিল ট্রলারে ওঠার আগে বড় ভাইয়ের কাছে ফোনে দোয়া চেয়েছিলেন। তারপর থেকে নিখোঁজ। একই এলাকার হারুন, নূর, শফির পরিবারও অপেক্ষায়। কবে ফিরবে তাদের প্রিয়জন।
উখিয়া–টেকনাফের অনেক স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীও নিখোঁজ বলে দাবি পরিবারের। তারা সবাই শেষবার জানিয়েছিল, মালয়েশিয়া যাচ্ছে। কেউ পরিবারের সম্মতিতে। আবার কেউ অমতে বা গোপনে।
একটি খবরের অপেক্ষা শত পরিবারের
লেঙ্গুরবিল গ্রামের আয়েশা বেগম দিনের বেশিরভাগ সময় শূণ্যতার দিকে তাকান। ভাবেন, হয়তো কোনো ফোন আসবে। অথবা কোনো খবর।
‘একটা খবর দিলেও হতো...সে বেঁচে আছে কি না।’ - বলতে বলতেই ভেঙে পড়লেন তিনি।
কক্সবাজার উপকূলে এখন প্রতিটি বাড়ি যেন একটি করে অপেক্ষার ঘর। কেউ কেউ এখনো আশা ছাড়েনি। কেউ হয়তো মনে মনে বুঝে গেছেন, প্রিয়জনের ফেরার আর সম্ভাবনা নেই।
সামাজিক সংগঠকদের ক্ষোভ
সামাজিক সংগঠন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা দুঃখ প্রকাশ করে বলছিলেন, ‘আন্দামান সাগরের ঢেউগুলো শুধু একটি ট্রলার নয়। গিলে নিয়েছে শত শত মানুষের স্বপ্ন, পরিবারের ভবিষ্যৎ। আর পেছনে রেখে গেছে অপেক্ষা, কান্না আর এক গভীর নীরবতা।’
‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন ক্ষোভ জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘কক্সবাজার উপকূল থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উপকূলের দূরত্ব প্রায় ২ হাজার থেকে পঁচিশ কিলোমিটার। শীত মৌসুমের শান্ত সাগরে যা অনায়াসে পাড়ি দেবার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন দালালচক্র। এটি প্রকাশ্যে ঘটে। কিন্তু, আমাদের প্রশাসন মানবপাচার কার্যক্রম প্রতিরোধ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। তারা কেবল ঘটনার পরে দায়সারা দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট। এতে কোন প্রাণ রক্ষা পায় না।’
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের দাবি, মানবপাচার ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রমে রাষ্ট্রকে নিয়োজিত হতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। যেকোন মূল্যে এ সলিলসমাধি বন্ধ করতে হবে।

