এক খাতায় তিন প্রজন্মের ভালোবাসা

ঘরে বসে পরিবারের সবাই সারা বছরের হালখাতা তৈরি করেন। তারপর সেটি পাঠিয়ে দেন ব্যবসাকেন্দ্রে। ছবি: আগামীর সময়
মঙ্গলবার সারা দেশে উৎসবের আমেজে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ। গান, শোভাযাত্রা আর রঙিন আয়োজনে মুখর ছিল চারদিক। তবে এই আনন্দের ভিড়ের মাঝেই নীরবে টিকে আছে ঘরোয়া এক পুরনো ঐতিহ্য হালখাতা। যেখানে হিসাবের চেয়ে বেশি জায়গা পায় স্মৃতি, প্রজন্ম আর ভালোবাসা। শুধু ব্যবসার হিসাব নয়, পারিবারিক বন্ধনেরও এক অদৃশ্য যোগসূত্র মিলে সেখানে।
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী নববর্ষের প্রথম দিন বুধবার। আর সেই পঞ্জিকার নিয়ম মেনেই বছরের পর বছর ধরে হালখাতা লিখে আসছে কিছু বনেদি ব্যবসায়ী পরিবার। তেমনই একটি নাম ইস্টার্ন কেমিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানের পরিচয় শুধু ব্যবসায় নয়, ঐতিহ্য রক্ষাতেও।
রঙ তৈরি ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত এই প্রতিষ্ঠানটি ‘অলিমপিক পেইন্টস’ ব্র্যান্ডের জন্য পরিচিত। খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহজুড়ে তাদের বাজার। একসময় বাংলাদেশ রেলওয়ের বগিতে ব্যবহৃত রঙও সরবরাহ করত তারা। কিন্তু ব্যবসার বাইরেও তাদের একটি পরিচয় আছে, প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা হালখাতার রেওয়াজ।
প্রতি বছর ১৫ এপ্রিল, পঞ্জিকার শুভক্ষণ দেখে হালখাতা লেখা হয়। কারখানা বা অফিসে নয়, এই আয়োজন বসে ঘরের ভেতরেই মালিকের আসকার দিঘির পশ্চিম পাড়ের বাসায়। যেন ব্যবসা নয়, পরিবারের একান্ত উৎসব।
সকাল সাড়ে ১০টার পর শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। পূজার ঘরে বসেন পরিবারের সদস্যরা। দাদা, বাবা, ছেলে তিন প্রজন্ম একসঙ্গে। পাশে নারী সদস্যদের উলুধ্বনি আর শাঁখধ্বনি। চারপাশে এক অন্যরকম আবহ শান্ত অথচ গভীর।
হালখাতা লেখার আগে পুরোহিত ঘট বসিয়ে পূজা করেন। মন্ত্রোচ্চারণে শুদ্ধ করা হয় লেখকদের। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে আসন পেতে বসেন তারা। এরপর শুরু হয় মূল পর্ব।
প্রতিটি খাতার প্রথম পাতায় লেখা হয় ‘ওম গণেশায় নমঃ’। একবার নয়, তিনবার। তারপর কাঁচা হলুদ দিয়ে মঙ্গলচিহ্ন আঁকা হয়। সবশেষে সিঁদুর মাখানো কয়েন দিয়ে দেওয়া হয় সিল। প্রতিটি ধাপে যেন জড়িয়ে থাকে বিশ্বাস, আস্থা আর ভালো থাকার প্রার্থনা।
এই হালখাতা লেখায় অংশ নেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রতন মজুমদার, পরিচালক প্রদ্যোৎ মজুমদার, দীপক মজুমদার ও সজীব সিকদার। পুরো আয়োজনের তত্ত্বাবধানে থাকেন প্রতিষ্ঠাতার স্ত্রী আশা রাণী মজুমদার।
প্রতিষ্ঠাতা গিরীন্দ্র লাল মজুমদার, তার ভাই অনিল মজুমদার ও বন্ধু ভূপতি সিকদার তিনজনই এখন প্রয়াত। কিন্তু তাদের শুরু করা এই রেওয়াজ থেমে যায়নি। এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম সেই দায়িত্ব বহন করছে।
হালখাতা শেষ হলে পূজার মিষ্টি ও ফল সবার মধ্যে বিতরণ করা হয়। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে। আর নতুন খাতাগুলো চলে যায় অফিসে, নতুন বছরের হিসাব শুরু করার জন্য।
এই পুরো আয়োজনটাই যেন শুধু ব্যবসার খাতা খোলা নয়, সম্পর্কেরও নতুন করে হিসাব মেলানো।
পরিবারের ছোট সদস্যদের জন্য দিনটি আরও বিশেষ। গিরীন্দ্র মজুমদারের নাতনি শ্রীপর্ণা ও শ্রীময়ী মজুমদার বলছিলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। এখন নিজেরা অংশ নিতে পারছি, এটা খুব আনন্দের। সারা বছর এই দিনের অপেক্ষায় থাকি।
এক খাতায় যখন তিন প্রজন্ম বসে, তখন তা শুধু হিসাবের খাতা থাকে না। হয়ে ওঠে স্মৃতির ধারক, ভালোবাসার প্রতীক।
সময় বদলেছে। ১৯৮৭ সালে সংশোধিত বাংলা পঞ্জিকা চালুর পর থেকে ১৪ এপ্রিল সরকারিভাবে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। তবু কিছু মানুষ এখনও পুরনো নিয়ম আঁকড়ে ধরে আছেন। কারণ, তাদের কাছে এটা শুধু তারিখ নয়, ঐতিহ্যের প্রশ্ন।
এই ঘরোয়া হালখাতা তাই মনে করিয়ে দেয়, উৎসব শুধু রঙে বা শব্দে নয়, কখনও কখনও নীরব ভালোবাসাতেও বেঁচে থাকে।

