দূষণের দেশে ২২৮ পরিবেশ মামলা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে মামলা যেন নিত্যদিনের এক বাস্তবতা। জমি নিয়ে বিরোধ, মারামারি, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতা—কোনো ঘটনা ঘটলেই আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়। এতটাই যে দেশের নানা অঞ্চলে ‘মামলাবাজ’শব্দটিও বেশ পরিচিত। সুপ্রিম কোর্টের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৭ লাখ ৪২ হাজার মামলা বিচারাধীন। কিন্তু এই মামলার সাগরে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে পরিবেশের ক্ষেত্রে।
নদী দখল হচ্ছে, বায়ু দূষণে শহরগুলো প্রায়ই বিশ্বের শীর্ষ দূষিত নগরীর তালিকায় উঠে আসে, শিল্পবর্জ্যে দূষিত হচ্ছে খাল-বিল ও কৃষিজমি, ইটভাটার ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনজীবন। পরিবেশ দূষণের এমন অসংখ্য ঘটনার মাঝেও ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিবেশ আদালতে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা মাত্র ২২৮টি। সংখ্যাটি এমন ধারণা দিতে পারে যেন দেশে পরিবেশ দূষণ বলেই কিছু নেই। প্রশ্ন হলো, পরিবেশ বিপর্যয়ের এত অভিযোগ থাকার পরও আদালতে মামলা এত কম কেন?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর অন্যতম কারণ পরিবেশ আদালতে মামলা দায়েরের জটিল আইনি প্রক্রিয়া। সাধারণ কোনো নাগরিক পরিবেশ দূষণের শিকার হলেও সরাসরি আদালতে গিয়ে মামলা করতে পারেন না। প্রথমে তাকে পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। অধিদপ্তর ব্যবস্থা না নিলে পরিবেশবাদী সংগঠনের মাধ্যমে অথবা সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা (পিআইএল) করা যেতে পারে। ফলে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ অন্য অনেক মামলার তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘ ও জটিল।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন লঙ্ঘন করছে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রতীয়মান হলে তিনি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে তা পরিশোধের নির্দেশ দিতে পারবেন। নির্দেশ অমান্য করে ক্ষতিপূরণ না দিলে মহাপরিচালক আদালতে ক্ষতিপূরণ কিংবা ফৌজদারি মামলা করতে পারবেন। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার সূচনা নির্ভর করে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগের ওপর। সংশ্লিষ্টরা মনে করেছেন, এই কাঠামোগত জটিলতার কারণেই পরিবেশ আইনে মামলা প্রায় নেই বললেই চলে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান আগামীর সময়কে বলেছেন, বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ ব্যাপক হলেও পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা অত্যন্ত কম। এর পেছনে মূলত আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা দায়ী। পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ অনুযায়ী অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদিত কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ ছাড়া মামলা করা কঠিন। ফলে সাধারণ নাগরিক সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ পান না।
দেশে পরিবেশ আদালতের ইতিহাসও খুব দীর্ঘ নয়। ঢাকার পরিবেশ আদালতের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৩ সালে। আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত সেখানে মোট ৫৯২টি পরিবেশ মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৭৬টি এবং বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে ১১৬টি মামলা। তবে একই আদালতে অন্য আইনের ৮ হাজার ২৩১টি মামলার বিচার চলছে।
একই চিত্র দেখা যায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ আদালতেও। সেখানে বর্তমানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ১০৫টি মামলা বিচারাধীন থাকলেও অন্যান্য আইনের প্রায় দুই হাজার মামলার বিচার চলছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেছেন, ‘আমাদের আদালতে পরিবেশ আইনের চেয়ে অন্য মামলার চাপ বেশি। বর্তমানে পাবলিক প্রসিকিউটরও নেই। পরিবেশ আদালতের মামলা অন্য তিনটি আদালতে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। এখন পরিবেশ আইনের ১০৫টি মামলা রয়েছে। অন্য আইনের প্রায় দুই হাজার মামলা রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই এনআই অ্যাক্টের মামলা।’
ঢাকার পরিবেশ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মাসুদুর রহমান বাদল বলেছেন, ‘আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়া সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি এই আদালতে মামলা করতে পারেন না। মামলা করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকের লিখিত রিপোর্ট প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর নিজেরাই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা বা সাজা দিয়ে থাকে।’
পরিবেশ আপিল আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আবু ইউসুফ সরকার বলেন, ‘পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ অনুযায়ী কেউ সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারেন না। পরিবেশ আদালতে মামলা কম আসে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রায়ের পর অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জরিমানা পরিশোধ করে দেয়। ফলে আপিলের প্রয়োজনও খুব কম হয়।’
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) মো. খালেদ হাসান বললেন, ‘পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা কম হলেও অধিদপ্তরে এ সংক্রান্ত অভিযোগ অসংখ্য। সারা দেশের বিভিন্ন স্পেশাল আদালতে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা দায়ের করে থাকে। ফলে নির্দিষ্ট পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা কম দেখালেও বাস্তবে পরিবেশ আইনের প্রয়োগ হচ্ছে।’
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশ্বের অন্যতম দূষণপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা কি বাস্তবতার প্রতিফলন? নাকি জটিল আইনি কাঠামো, সীমিত প্রবেশাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার কারণে পরিবেশ ন্যায়বিচারের পথ এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে?
পরিবেশবিদদের মতে, পরিবেশ আদালতকে কার্যকর করতে হলে নাগরিকদের সরাসরি মামলা করার সুযোগ বাড়ানো, আদালতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় দূষণ বাড়লেও পরিবেশ আদালতের পরিসংখ্যান হয়তো এমনই নীরব থেকে যাবে।




