এক রুটেই পাচারকারীদের পকেটে ৪ হাজার কোটি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকায় রডমিস্ত্রির কাজ করতেন রংপুরের মিঠাপুকুরের এরশাদুল মিয়া (৩২)। পরিচয় হয় শরীয়তপুরের এক রাজমিস্ত্রির সঙ্গে। লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়া নিয়ে প্রায়ই ফোনে কথা বলতেন ওই রাজমিস্ত্রি তার লিবিয়াপ্রবাসী এক আত্মীয়ের সঙ্গে। একপর্যায়ে এরশাদুলও তাদের প্রলোভনে পা বাড়ান।
এরশাদুল আগামীর সময়কে বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি লিবিয়ার বেনগাজি শহরে যান। কিন্তু সেখানে এক বছর তার কোনো কাজ ছিল না। লিবিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠী তাকে একদিন অপহরণের চেষ্টা করে। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে দেশে ফেরেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ইউরোপ যাওয়ার বিপজ্জনক পথে সক্রিয় সংগঠিত আন্তর্জাতিক পাচার চক্র। লিবিয়ায় পৌঁছনোর পর গেম হাউজে নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় এবং সবশেষে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার খরচ— সব মিলিয়ে পাচারকারীদের কাছে বাংলাদেশি অভিবাসীরা হয়ে উঠেছেন ‘সোনার ছেলে’।
এমন পরিস্থিতিতে আজ ৩০ জুলাই পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি রয়েছে সরকার ও দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য বলছে, ২০১০ সালে লিবিয়ায় যাওয়ার অভিবাসন ব্যয় ছিল ৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা। ২০২৫ সালে এই ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অভিবাসন সেক্টরে খ্যাতনামা মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টারের (এমএমসি) গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লিবিয়া-ইতালি-গ্রিস রুটে বাংলাদেশি অভিবাসীদের কেন্দ্র করে বছরে অন্তত ১৬০-১৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য হয়েছে। ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ইতালিতে বাংলাদেশের অবৈধভাবে গেছে ২০ হাজার ২৫৯ জন। এই হিসাবে একজনের গড়ে ২০ লাখ টাকা খরচ হলে ওই বছর অবৈধপথে বাণিজ্য হয়েছে ৪ হাজার ৫১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
লিবিয়া-ইতালি রুট: বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার বিপজ্জনক অভিবাসন রুট নিয়ে গবেষণা করেছে মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার (এমএমসি)। ‘ন্যাভিগেটিং নিউ করিডরস: দ্য ইভলভিং রুট অব বাংলাদেশি মাইগ্রেশন টু ইতালি থ্রু লিবিয়া’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়েছে গত মার্চে। এতে অর্থায়ন করেছে ডেনমার্ক ও একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এমএমসির তথ্য বলছে, লিবিয়ায় পৌঁছানোর জন্য বর্তমানে প্রধান রুট ঢাকা-দুবাই-মিসর-বেনগাজি (লিবিয়া)। ঢাকা বিমানবন্দরে কড়াকড়ি বাড়লে দালালরা অভিবাসীদের সড়কপথে ভারতে পাঠান। সেখান থেকে শ্রীলংকা হয়ে দুবাই বা কুয়েত দিয়ে নেওয়া হয় লিবিয়ায়। এরশাদুল জানিয়েছেন, তিনি ছিলেন দ্বিতীয় রুটের যাত্রী।
২০২৪ সালে ইতালি পৌঁছানো প্রায় ১৪ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসীর তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন দিয়েছে এমএমসি। এতে বলা হয়েছে, চক্রটি বিভিন্ন দেশের আলাদা এজেন্টের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। গ্রামের ছোট দালাল থেকে শুরু করে বড় রিক্রুটি এজেন্সি— সবাই এই চক্রের অংশ। তারা বৈধ কর্মসংস্থানের কথা বলে বা ‘ইতালি যাওয়ার প্যাকেজ’ বিক্রি করে অভিবাসীদের লিবিয়ায় পাঠায়।
যদিও মানব পাচারে কোনো এজেন্সির জড়িত থাকার কারণ নেই বলে দাবি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরীর। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, বৈধপ্রক্রিয়ায় তারা বিদেশে লোক পাঠান। সেখান থেকে যদি কেউ প্রলুব্ধ হয়ে পালিয়ে যান বা সেটা তার দায়িত্ব।
অভিবাসনসংশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশের চেষ্টা করা মানুষের শীর্ষে বাংলাদেশ। তবে ২০২৬ সালে এসে গ্রিসে প্রবেশ করার দিক থেকেও বাংলাদেশিরা প্রথম স্থানে। এর মধ্যে গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ১২ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জে। পাচারকারীদের নির্দেশে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এমনটিই জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
ভূমধ্যসাগর (লিবিয়া থেকে ইতালি বা গ্রিসগামী) রুটে প্রতি বছর গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার অভিবাসী মারা যান বা নিখোঁজ হন। আইওএমের তথ্য দেখাচ্ছে, ভূমধ্যসাগরীয় রুটে মারা যাওয়া বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য অংশই বাংলাদেশি। গত মার্চে প্রকাশিত আইওএমের ‘ডিসপ্লেসমেন্ট ট্র্যাকিং ম্যাটিকস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ২৪ হাজার ৩১৮ জন বাংলাদেশি সমুদ্র ও স্থলপথে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই হার ৫৯ শতাংশ বেশি। ভূমধ্যসাগরের এই রুটে প্রতি তিনজন অবৈধ অভিবাসীর মধ্যে একজন বাংলাদেশি।
এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) বলেছে, গত ৬ মাসে সমুদ্রপথে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি, যা মোট প্রবেশকারীদের ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর রয়েছে সোমালিয়া (১১ দশমিক ৪ শতাংশ ও সুদান ৯ দশমিক ৫ শতাংশ)। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে গেছেন ৩ হাজার ৬০৮ বাংলাদেশি।
অবৈধ অভিবাসীর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত কী— জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বিদেশে লোক পাঠাতে যে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো আইনের আওতায় আনতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈধ কর্মসংস্থান বাড়াতে বিএমইটিকে কীভাবে আরও সক্রিয় করা যায়— তা ভাবা হচ্ছে।’
এদিকে, আইওএম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত ১ ও ২৪ জুন দুই দফায় লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে ৩৪৪ জন উদ্ধার করে ঢাকায় আনা হয়েছে।
বছরে বিশাল বাণিজ্য: একজন অভিবাসীর বাংলাদেশ থেকে ইতালি পৌঁছাতে ১০-১৪ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। তবে লিবিয়ায় মুক্তিপণ ও অতিরিক্ত শোষণসহ এটি অনেক ক্ষেত্রে ১৭ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। এই হিসাবে বাংলাদেশ-লিবিয়া-ইতালি রুটে এই চক্র ২০২৪ সালে ১৬০-১৯০ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে, যা বাংলাদেশি টাকার হিসাবে ১ হাজার ৯২০ কোটি থেকে ২ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। এ তথ্য দিয়ে এমএমসি বলছে, যারা লিবিয়ায় মারা গেছেন বা ইতালিতে পৌঁছাতে পারেননি— তাদের ব্যয় এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই হিসাব ধরলে টাকার অঙ্ক আরও বাড়বে।
এমএমসির তথ্যমতে, বাংলাদেশে সক্রিয় দালাল ও এজেন্সি চক্র, দুবাই ও মিসরকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ট্রানজিট সিন্ডিকেট, লিবিয়ার স্থানীয় স্পন্সর, ড্রাইভার, মিলিশিয়া চক্র, ‘গেম অপারেটর’ বা নৌযান পরিচালক চক্র এবং ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক প্রলোভনকারী চক্র এর সঙ্গে জড়িত। অনেক অভিবাসীকে এক পাচারকারীর কাছ থেকে আরেকজনের কাছে ‘বিক্রি’ করা হয়। সমুদ্রে লিবিয়ার কোস্ট গার্ড ধরলেও অভিবাসীদের মুক্তি মেলে না; তাদের আবার পাচার চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। আবার মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
এমএমসির প্রতিবেদন ধরে আগামীর সময় কথা বলেছে লিবিয়াফেরত যুবক ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইউনিয়নের এনায়েতুল্লাহ রিয়াদের (২৪) সঙ্গে। তিনি এলাকায় সারের ব্যবসা করতেন। দালালের খপ্পরে পড়ে তিনি লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ায় সিদ্ধান্ত নেন।
এনায়েতুল্লাহর ভাষ্যমতে, লিবিয়া যাওয়ার আগে দালাল চক্রকে ৫ লাখ টাকা দেন। লিবিয়া যাওয়ার পর চক্রটি আরও ৫ লাখ টাকা নেয় ইতালি নেওয়ার কথা বলে; কিন্তু তারা পৌঁছায় না। উল্টো তাকে জিম্মি করে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করলে বাড়ি থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পাঠানো হয়। ইতালির উদ্দেশে ট্রলারে করে সাগরে পাঠালে লিবিয়ার কোস্ট গার্ড তাকে আটক করে কারাগারে পাঠায়। সেখান থেকে এই চক্র উদ্ধার করে তাকে আবার নির্যাতন করে। পরে তার পরিবার থেকে জমি বিক্রি ও বন্ধক রেখে আরও ৭ লাখ টাকা পাঠালে মুক্তি পান এনায়েতুল্লাহ। এনায়েতের হিসাবে ওই চক্র তার কাছ থেকে সাড়ে ১৮ লাখ টাকা নেয়।
৯৩ শতাংশই ক্যাম্পে বন্দি: বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক লিবিয়াগামী অবৈধ অভিবাসীদের যাত্রাপথ বিশ্লেষণ করে বলেছে, ঢাকা থেকে মিসর, দুবাই বা তুরস্ক হয়ে লিবিয়া গেছেন অধিকাংশ মানুষ। ভালো চাকরির প্রলোভনে গেলেও ৭৫ শতাংশ চাকরি বা কোনো কাজ পায়নি। উল্টো তাদের বন্দি থাকতে হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশ ক্যাম্পে বন্দি ছিল। তাদের ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার। এ ছাড়া লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ৬৯ শতাংশের মুক্ত চলাচল খর্ব হয়েছে। অধিকাংশ ঠিকমতো খাবার পায়নি। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘পাচারকারীরা এখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সে তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পিছিয়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।’
মানব পাচারে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত রয়েছে বলে মন্তব্য করলেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না। তারা শুধু উৎস দেশগুলোর ঘাড়ে দায় চাপিয়ে একধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
তাসনিম সিদ্দিকী বলছিলেন, বাংলাদেশের কিছু রিক্রেুটিং এজেন্সির দায় আছে। আগে এমন কিছু ঘটলে মানব পাচার আইনে বিচার হতো। কিন্তু ২০১৩ সালের অভিবাসন আইন অত শক্তিশালী নয়। যে কারণে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো পার পেয়ে যাচ্ছে। এসব পাচার বন্ধ করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।




