নতুন রুট কম্বোডিয়া

মানব পাচারের প্রতীকী ছবি
বিদেশে একটি ভালো চাকরি, মাস শেষে মোটা বেতন আর পরিবারের ভাগ্যবদলের স্বপ্ন। ফরিদপুরের ভাঙ্গার এক নারী এমনই স্বপ্ন নিয়ে পরিচিত এক এনজিও কর্মীর মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার প্রস্তাব পান। বলা হয়েছিল, একটি প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনক চাকরি হবে। চাকরির ভিসা, টিকিট ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার নামে তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পরই বদলে যায় সবকিছু। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সেখানে তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, জিম্মি করে রাখা হয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। দেশে ফিরতে চাইলে হুমকি দেওয়া হয় অন্য চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার। শেষ পর্যন্ত নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২ জুলাই দেশে ফেরেন তিনি। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় ঠোকেন মানব পাচার মামলা।
এত গেল মাত্র একটি ঘটনা। আগে সীমান্তপথে পাচার ছিল বড় উদ্বেগ। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, অনলাইন রিক্রুটমেন্ট এবং ডিজিটাল প্রতারণা। কম্বোডিয়া, লাওসের মতো দেশে স্ক্যাম সেন্টারে ভয়াবহ বন্দিশালার খবর বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার হওয়ার পরও খোদ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বিদেশযাত্রায় অনুমতি দিয়ে আসছিল। সাইবার ট্র্যাপের ভয়াবহতা আঁচ করে জাতিসংঘ এ বছরের ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক মানব পাচার দিবসটির প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশে মানব পাচারের ঘটনায় ৬ হাজার ৮২৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১০ হাজার ৪৪৪ জনকে মানব পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে ৭ হাজার ১৯০ জনকে। একই সময়ে মানব পাচার চক্রের ৩০ হাজার ২৯৫ জন সদস্যকে অভিযুক্ত করা হলেও গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ২৮০ জন। এর বাইরে মানব পাচার রোধে সম্প্রতি নতুন আইন হলেও, এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অভিবাসন এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রবাসী অভিবাসন খাতে শৃঙ্খলা আনতে অনেক কাজ হাতে নিয়েছি। বিশ্বের কোন কোন দেশে কাজের সুযোগ রয়েছে, তা চিহ্নিত করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ যাতে দালাল চক্রের খপ্পরে না পড়ে, সে বিষয়েও কাজ করতে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
মানব পাচার বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, কম্বোডিয়া এবং লাওসের মতো দেশে ভয়াবহ সাইবার স্ক্যামিং চক্রের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত হয়েছে। ওই চক্রের তৎপরতা ঠেকাতে জড়িত অনেককে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রেপ্তার করেছে। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সমন্বয়ে গত মাসে কম্বোডিয়া থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। শেষ চার দিনেই দেশে ফেরেন ৩৬২ জন। এর আগে আরেক দফায় ফিরেছিলেন ২২১ জন। দেশে ফিরে অনেকেই অভিযোগ করেন, চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাদের জোর করে অনলাইন প্রতারণার কাজে লাগানো হয়েছিল। কেউ অস্বীকৃতি জানালে মারধর, আটকে রাখা, খাবার না দেওয়া, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া কিংবা মুক্তিপণ দাবি করার মতো নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে। ফিরে আসা বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একদলকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে এবং আরেক দলকে ভ্রমণভিসায় কম্বোডিয়া নেওয়া হয়েছে। এরপর সেদেশে থাকা কিছু বাংলাদেশি নাগরিক তাদের চায়নিজ নিয়ন্ত্রিত স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দিয়েছেন।
বিচার নিয়েও হতাশা: মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে ২০১২ সালে সরকার আইন করার পর থেকে মানব পাচার আইনে নিয়মিত মামলা হলেও অধিকাংশ মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। আবার যেগুলোর বিচার শেষ হচ্ছে, সেখানে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানব পাচার মামলা-সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টি মামলা এখনো তদন্তাধীন। আর ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন।
এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে— পাঁচ মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে নতুন করে ৭১, ফেব্রুয়ারিতে ৬৬, মার্চে ১১০, এপ্রিলে ১৩০ এবং মে মাসে ১২৩টি মামলা হয়েছে। ১৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০২৫ সালে বা এ বছর কোনো মামলায় কারও দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালন প্রতিরোধে সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ‘অভিবাসী চোরাচালান’-সংক্রান্ত অপরাধকে আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এ আইনেও এককভাবে ও সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান আগামীর সময়কে বলেছেন, আইন করলেই শুধু হবে না, আইনের বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে দরকার সাধারণ মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি করা। সাইবার স্ক্যাম এখন মানব পাচারের ভয়াবহ এক রূপ। এ বিষয়টি মাথায় রেখে কর্তৃপক্ষকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে মূল অপরাধীদের। একই সঙ্গে পাচারের সঙ্গে জড়িতদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। মানব পাচারপ্রবণ জেলাগুলোয় ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
দালাল থেকে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট: অনুসন্ধানে দেখা যায়, মানব পাচার চক্রের কাঠামো এখন বহুস্তর বিশিষ্ট। গ্রামের স্থানীয় দালাল প্রথমে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখায়। এরপর জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সমন্বয়কারী ভুক্তভোগীর পাসপোর্ট, ভিসা ও অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা করে। পরে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট সদস্যরা লিবিয়া, দুবাই, ওমান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার কিংবা কম্বোডিয়ায় তাদের গ্রহণ করে। সেখানে অনেকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, জিম্মি করে নির্যাতন কিংবা জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া যায়।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) বলছে, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ অনিয়মিত অভিবাসী কোনো না কোনো অনানুষ্ঠানিক দালাল বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভর করেন। এই দালাল নেটওয়ার্কই মানব পাচারের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।




