নদী উদ্ধারের নায়ক তুহিন ওয়াদুদ

নীলফামারীর ডোমারে স্থানীয়দের নিয়ে শাখা দেওনাই নদ সুরক্ষা কমিটি গঠন করে দেন ড. তুহিন ওয়াদুদ
একের পর এক নদ-নদী উদ্ধারের দৃষ্টান্ত রেখে চলেছেন ড. তুহিন ওয়াদুদ। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করলেও তিনি একজন নদী গবেষক, সংগঠক ও পরিবেশবিষয়ক লেখক। নদীবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক। তার নেতৃত্বে এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া চারটি নদী হলো কুড়িগ্রামের চাকিরপশার, নীলফামারীর শাখা দেওনাই, রংপুরের শালমারা ও খটখটিয়া।
তুহিন ওয়াদুদ নদী উদ্ধারের গল্প শোনালেন, “নীলফামারীর ডোমার উপজেলার শাখা দেওনাই নদ অবৈধভাবে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি দখলে রেখেছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনও নদের শ্রেণি থেকে নদটিকে বাতিলের প্রস্তাব তৈরি করে। খবর পেয়ে ছুটে যাই নদের পাড়ে। সেখানে স্থানীয় আব্দুল ওয়াদুদকে আহ্বায়ক করে গঠন করি ‘শাখা দেওনাই নদী সুরক্ষা কমিটি।’ আমি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করি। সেই কমিটির মাধ্যমে বিক্ষোভ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি দেওয়াসহ নানাভাবে আন্দোলন তীব্র হলে ২০১৯ সালে প্রশাসন বাধ্য হয় তাদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে।”
‘গায়ের জোরে যারা নদের জমি দখল করে রেখেছিলেন তারা অবৈধ দখল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পরে নদটি সরকারি তালিকায় যুক্ত করার ব্যবস্থাও করা হয়’— যোগ করেন তিনি।
শাখা দেওনাই নদ সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল ওয়াদুদের কৃতজ্ঞতা, ‘তুহিন ওয়াদুদের সক্রিয় ভূমিকায় আমরা শুধু একটি নদ উদ্ধার করিনি, বরং এখন পুরো জেলার নদ-নদীগুলো দেখভাল করার সুযোগ পেয়েছি। তার প্রতি নদপাড়ের মানুষের ভালোবাসার শেষ নেই।’
রংপুরের মিঠাপুকুরে শালমারা নদীটির মূল প্রবাহের বেশিরভাগ অংশ কয়েক ব্যক্তি তাদের নামে অবৈধভাবে লিখে নিয়েছিলেন। এর প্রতিবাদে স্থানীয়রা আন্দোলন করে জেলও খেটেছেন, কিন্তু নদী উদ্ধার হয়নি। জেল খেটেছেন সত্তরোর্ধ্ব শাহ জালাল। তাকে আহ্বায়ক করে শালমারা নদী সুরক্ষা কমিটির মাধ্যমে নদীটি উদ্ধারের আন্দোলন শুরু হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নদীটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় ২০২২ সালে। তুহিন ওয়াদুদ এই নদী উদ্ধারেরও মূল কাণ্ডারি।
তুহিন ওয়াদুদ বদরগঞ্জের খটখটিয়া নদী দখলের খবর পান প্রকৌশলী ফজলুল হকের কাছে। নদীটি উদ্ধারে এই প্রকৌশলীর ভূমিকাও রয়েছে। তুহিন ওয়াদুদ নদীটির সুরক্ষার জন্য খটখটিয়া নদী সুরক্ষা কমিটি গঠন করেন। আন্দোলনের মাধ্যমে নদীতে অবৈধ দখলদারদের মালিকানা বাতিল হয়েছে ২০২৪ সালে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট-উলিপুর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত একটি নদ চাকিরপশার। এই নদটি সুরক্ষায়ও কমিটি গঠন করা হয়, সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন তুহিন ওয়াদুদ। নদের ১৪১ একর জায়গা দখল করে রেখেছিলেন প্রভাবশালীরা। অনেক আন্দোলনের পর ২০২২ সালে এই জায়গা দখলমুক্ত করা হয়।
চাকিরপশার নদ সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক খন্দকার আরিফ কৃতজ্ঞতা জানালেন, তুহিন ওয়াদুদের সক্রিয় চেষ্টায় আমরা এ নদটি উদ্ধার করতে পেরেছি।
তুহিন ওয়াদুদ বললেন, ‘নদীগুলো উদ্ধার করতে গিয়ে অবৈধ দখলদারদের মামলা-হামলার শিকার হয়েছি, মার খেয়েছি। জীবনের হুমকি, মানসম্মানের প্রতি আঘাত, আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে নদী উদ্ধারে কাজ করছি। বর্তমানে আন্দোলন চলছে নীলফামারীর কুমলাই নদী রক্ষার।’ বেশ কয়েকটি নদী উদ্ধারে আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বললেন, ড. তুহিন ওয়াদুদ নদী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। যেকোনো আন্দোলনে একজন দক্ষ সংগঠকের প্রয়োজন হয়। রংপুর অঞ্চলের নদী রক্ষায় সেই সংগঠকের কাজটিই করছেন তুহিন ওয়াদুদ। তার নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি নদী উদ্ধার হয়েছে।




