কৃষকের তৃষ্ণা মেটান আকরাম

ক্ষেতের পাশে আকরামের স্থাপন করা নলকূপ
দুপুরের প্রচণ্ড রোদ। চারদিকে ধু ধু মাঠ। ফসলের পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। শরীরের সব শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে আসে, বুকের ভেতর জ্বলে ওঠে তীব্র তৃষ্ণা। একটু পানির জন্য তখন বাড়ির দিকে ছুটে যাওয়ারও সুযোগ নেই। অনেক বছর আগে এমনই এক মাঠে তৃষ্ণায় কাতর হয়েছিলেন আকরাম হোসেন। বিশুদ্ধ পানি না পেয়ে কখনো নালা-ডোবার পানিও পান করতে হয়েছে তাকে। সেই কষ্টই আজ তাকে নিয়ে গেছে মানুষের কাছে।
পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আকরাম হোসেন (৪০) ছয় বছর ধরে চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শার বিভিন্ন মাঠে তৃষ্ণার্ত কৃষকের জন্য বসিয়েছেন ৩০টি নলকূপ। মাঠেই নির্মাণ করেছেন দুটি মসজিদ। গড়ে তুলেছেন মহিলা মাদ্রাসা। অসহায় মানুষের জন্য ঘর, খাবার, পোশাক এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বই-খাতা ও স্কুল ড্রেসের ব্যবস্থাও করছেন নিয়মিত।
চৌগাছার পাশাপোল ইউনিয়নের বানরহুদা গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে আকরাম হোসেন ওই গ্রামে বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছেন।
২০০৭ সালে যশোর সরকারি এমএম কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেন তিনি। বর্তমানে বাড়ীয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
২০২০ সাল থেকে নিজের অর্থ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় শুরু করেন মানবিক কর্মকাণ্ড। চৌগাছার পাশাপোল, বাড়ীয়ালী, পলুয়া, আড়াদদাহ, উজিরপুর ও মাকাপুরের মাঠে তিনি নলকূপ বসিয়েছেন। এ ছাড়া ঝিকরগাছার বিষহরি ও গুলবাকপুর এবং শার্শার বেলতা-কাশিপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠেও স্থাপন করেছেন নলকূপ। ফলে মাঠে কাজের ফাঁকে কৃষকরা এখন সহজেই বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারেন।
মাঠে কাজ করা কৃষকদের নামাজের সুবিধার কথাও ভেবেছেন তিনি। বানরহুদা-পাশাপোল-দশপাখিয়া-বাড়ীয়ালী গ্রামের মধ্যবর্তী মাঠে এবং পলুয়া-মাগুরা গ্রামের মধ্যবর্তী মাঠে নির্মাণ করেছেন দুটি মসজিদ। পাশাপোলে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি মহিলা মাদ্রাসা। সন্তানদের অবহেলায় অসহায় হয়ে পড়া ছয়জন নিঃস্ব ও গৃহহীন মানুষকে নির্মাণ করে দিয়েছেন ঘর।
আকরাম হোসেন বলেছেন, ‘আমি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। টাকার অভাবে ২২ কিলোমিটার দূরে যশোর শহরে হেঁটে কলেজে গিয়েছি। লেখাপড়ার পাশাপাশি মাঠে কাজ করেছি। রোদে কাজ করার সময় প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেত। বিশুদ্ধ পানি না পেয়ে নালা-ডোবার পানিও খেতে হয়েছে। তখন থেকেই মনে হতো, আল্লাহ যদি কখনো সুযোগ দেন, মানুষের জন্য কিছু করব।’
স্থানীয় কৃষকরা বলেছেন, ‘মাঠে তৃষ্ণার সময় মাস্টার আকরামের টিউবওয়েলের পানি আমাদের কাছে আশীর্বাদের মতো। এখন পানি খেতে, অজু করতে কিংবা নামাজ পড়তে দূরে যেতে হয় না।’
উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের বললেন, ‘শিক্ষক আকরাম হোসেন আমাদের ইউনিয়নের একজন গর্বিত সন্তান। সমাজের নানা সমস্যা সমাধানে তার উদ্যোগ ও কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি চাই, তার কাজ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে যুব ও তরুণরা সুন্দর ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে এগিয়ে আসুক এবং আত্মনিয়োগ করুক।’



