এ বাজি তদবিরবাজি
টাকায় মেলে পাস অতিষ্ঠ সচিবালয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকার আসে, সরকার যায়। থেকে যায় তদবিরবাজ। পাল্টায় শুধু নিজস্ব পরিচয়। কখনো রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আবার কখনো সংবাদকর্মী অথবা প্রভাবশালীদের আত্মীয়স্বজন। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় রাষ্ট্রের সংরক্ষিত এলাকা হলেও, তাদের প্রবেশে নেই কোনো সমস্যা। কারণ টাকায় মিলছে প্রবেশ পাস। এভাবেই নির্বিঘ্নে চলে তাদের নানা তৎপরতা। কেন্দ্র থেকে মাঠ প্রশাসনে তদবিরবাজি যেন ‘স্থায়ী সংস্কৃতি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মাত্র ৫০০ টাকায় সচিবালয়ে ঢুকে করছে কোটি কোটি টাকার তদবির।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তদবিরবাজসহ যে কেউ ঢুকতে পারছেন যেকোনো মন্ত্রণালয়ে। আর এই পাস-বাণিজ্যে জড়িত খোদ সচিবালয়ের কিছু কর্মচারী ও পুলিশ সদস্য। তদবিরের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে প্রকাশ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি ও দরপত্রের বিল তুলে দেওয়াসহ নানা কাজে দালালি করছেন তারা। সবচেয়ে বেশি তদবিরের চাপ সামাল দিতে হচ্ছে শিক্ষা, স্বরাষ্ট্র, ভূমি, জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার বিভাগ, আইন, যোগাযোগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে। এসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের দপ্তরে সকাল ১০টা থেকেই তদবিরের চাপ শুরু হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের তদবিরের চেয়ে দলীয় পরিচয়ের তদবিরই বেশি। কেউ মন্ত্রীর লোক, এমপি, কিংবা দলীয় নেতা, এমপির আত্মীয়স্বজন প্রভৃতি পরিচয়ের। স্বাভাবিক তদবিরের বাইরে প্রভাবশালী মহলের তদবিরের চাপেও আমলারা বিপাকে রয়েছেন। পছন্দ অনুযায়ী কর্মকর্তা পোস্টিং দিতে গিয়ে নানামুখী তদবিরের চাপে মন্ত্রণালয় হিমশিম খাচ্ছে। ডিসি, ইউএনও এবং প্রেষণ পদসহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পোস্টিং নিয়ে তদবির বেশি। বিশেষ করে, লোভনীয় পদে পোস্টিং পেতে কর্মকর্তাদের অনেকে যে যার লাইনে জোর তদবির চালাচ্ছেন।
গত মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মুহা. মনিরুজ্জামানের অফিস সহায়ক আলী হায়দার ১ হাজার টাকা নিয়ে নিজের আইডি কার্ড পাঞ্চ করে জিএম সুমন ও জাকির হোসেন নামে দুই ব্যক্তিকে সচিবালয়ে প্রবেশ করান। অনুপ্রবেশকারী দুজন সচিবালয়ের ভেতরে সাংবাদিক নামধারী তদবিরবাজ মোহাম্মদ আলী আবীরের সঙ্গে তদবিরের টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের আটক করলে অনুপ্রবেশকারীরা স্থানীয় সরকার বিভাগের অফিস সহায়কের নাম ফাঁস করেন এবং টাকার বিনিময়ে প্রায়ই সচিবালয়ে প্রবেশ করেন বলে জানিয়েছেন। বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে আলী হায়দারকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পাশাপাশি অবৈধ দর্শনার্থীদের ১ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এরপর তদবিরবাজ আবীর নিজেকে দুটি অখ্যাত পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার পরিচয় দেন। তবে তিনি কোনো অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেখাতে পারেননি। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, অর্থমন্ত্রীর পিএসের দপ্তর থেকে তার পাস ইস্যু হয়েছে। বৈধ পাস থাকায় আবীরকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা শাখায় হস্তান্তর করা হয়। পরে সেখানে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান আবীর। এর আগে তদবিরবাজি প্রমাণিত হওয়ায় এই আবীরের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করেছিল তথ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় প্রায় প্রতিদিনই সচিবালয়ে প্রবেশ করে নানা ধরনের তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
সচিবালয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের উপকমিশনার মাহমুদুল কবীর আগামীর সময়কে বললেন, ‘মঙ্গলবার সচিবালয়ের ভেতরে মোহাম্মদ আলী আবীর নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তদবিরের টাকা নিয়ে জিএম সুমন ও জাকির হোসেনের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের আটক করেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতে অপরাধ স্বীকার করায় তাদের জেল-জরিমানা দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বহুজাতিক কোম্পানির এক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ওই প্রতিনিধি জানালেন, এক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে পাস নিয়ে নিয়মিত প্রবেশ করেন সচিবালয়ে। এজন্য প্রতিবার গুনতে হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে পুলিশ কর্মকর্তার ফোন নাম্বার সংগ্রহ করা হয়। পরে এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় গোপন করে ওই পুলিশের কাছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। তাতে রাজিও হন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে তাকে তাৎক্ষণিক সচিবালয় থেকে বদলি করা হয়।




