দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
শয্যার চেয়ে রোগী দ্বিগুণ, বারান্দা–মেঝেতে চিকিৎসা
- শয্যা ৫০০টি, প্রতিদিন ভর্তি ১১০০ রোগী
- চিকিৎসক পদ ২১৮, কর্মরত মাত্র ১২৭ জন
- প্যাথলজি সেবায় ধীরগতি, ক্ষোভ রোগীদের
- ব্যাটারিচালিত অটো ও অ্যাম্বুলেন্স দখলে হাসপাতাল চত্বর

ছবি: আগামীর সময়
হাসপাতালের প্রতিটি বেডই রোগীতে পূর্ণ। করিডরে রাখা হয়েছে অতিরিক্ত বেড। কোথাও আবার মেঝেতে বিছানা পেতে চলছে চিকিৎসা। প্যাথলজি বিভাগে কর্মী সংকট, দুপুরের আগেই বন্ধ হচ্ছে সেবা। বাধ্য হয়ে রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকে। এতে ভোগান্তির সঙ্গে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রোগীরা। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাস্তব চিত্র এমনই।
সম্প্রতি সরেজমিন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও কর্মীরা। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকেন প্রায় ১১০০ রোগী। বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী। তাদের সেবা দিতে কাজ করছেন মাত্র ১২৭ চিকিৎসক। এর সঙ্গে রয়েছে জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট। ফলে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২১৮ চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১২৭ জন। হিসাব অনুযায়ী ৪২ শতাংশ চিকিৎসকের পদ শূন্য।
৫৪০ নার্সের বিপরীতে রয়েছেন ৫২৫ জন। এ ছাড়া ২১৭ জন আউটসোর্সিং কর্মী রয়েছেন। এ ছাড়া দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির ১৩৩ পদের বিপরীতে ৬৫টি পদ শূন্য রয়েছে। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকায় ওষুধ ও খাবার সরবরাহেও চাপ তৈরি হচ্ছে। সরকারি বরাদ্দ ৫০০ রোগীর হিসাব অনুযায়ী হওয়ায় অতিরিক্ত রোগীদের সবাইকে খাবার দেওয়া সম্ভব হয় না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এতে বেড না পাওয়া রোগীদের বাহির থেকে খাবার কিনে খেতে হয়, কিনতে হয় চিকিৎসা সামগ্রীও।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বহির্বিভাগে সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখা হয়। সকাল ৮টার আগেই টিকিট কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে যান কয়েক হাজার মানুষ। পরে চিকিৎসকের কক্ষের সামনেও তৈরি হয় দীর্ঘ সারি। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় গুরুতর অসুস্থ রোগী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের।
হাসপাতালে চিকিৎসকদের পরামর্শে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে গিয়েও ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা। জনবল সংকটের কারণ দেখিয়ে বেলা ১২টার মধ্যেই বন্ধ করা হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাউন্টার। ফলে দূর থেকে আসা রোগীদের বাইরে থেকে করাতে হচ্ছে অধিকাংশ পরীক্ষা।
রাশেদা খাতুন (৩৮) গত ২ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও পীরগঞ্জ থেকে পেটে ব্যাথার সমস্যা নিয়ে বহির্বিভাগেে চিকিৎসক ডা. রাশিদুল ইসলামের কাছে যান। চিকিৎসক সমস্যা শুনে আলট্রাসাউন্ড করার পরামর্শ দেন। পরে আলট্রাসাউন্ড করার জন্য প্যাথলজি বিভাগের কাউন্টারে গেলে দায়িত্বরত এক কর্মচারী সময় শেষ বলে তাকে ফিরিয়ে দেন। এ সময় প্যাথলজির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন তাকে ডেকে হাসপাতালের বাইরে থাকা ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানে ৭০০ টাকায় তিনি আলট্রাসাউন্ড করান। অথচ হাসপাতালে ২৫০ টাকায় তা করা সম্ভব ছিল।
রাশেদা খাতুন আক্ষেপ করে আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, আমরা গরিব মানুষ, তাই দূর থেকে অল্প টাকায় সেবা নিতে সরকারি হাসপাতালে আসি। কিন্তু এখানেও নানা প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করে হয়রানি করা হয়। তাহলে আমরা কোথায় যাব?
হাসপাতালে ভর্তি একাধিক রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের বাইরে পরীক্ষা করানোর সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে একটি দালাল চক্র। হাসপাতালের ভেতরের বহির্বিভাগ, প্যাথলজি, জরুরি বিভাগ ও প্রধান ফটকের আশপাশে থাকা এসব দালাল কম খরচে এবং দ্রুত পরীক্ষা করানোর কথা বলে রোগীদের নিয়ে যান বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। বিশেষ করে, দূর থেকে আসা গরিব রোগীদের টার্গেট করা হয়।
এদিকে হাসপাতালের এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ পরীক্ষা–নিরীক্ষার অনেক যন্ত্রপাতিই অচল। এতে বেসরকারি হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে রোগীদের। ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সরকারি হাসপাতালের চেয়ে কমপক্ষে ২০-৪০ শতাংশ অতিরিক্ত টাকা ব্যয় হচ্ছে রোগীদের।
এসব সমস্যার পাশাপাশি হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ রোগীদের জীবন করেছে দুর্বিষহ। প্রতিটি ভবনের ফাঁকা অংশগুলো ময়লার ভাগারে পরিণত হয়েছে, যা থেকে ছড়ায় দুর্গন্ধ। এ ছাড়া টয়লেটগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ভোগান্তি বেড়েছে রোগী ও স্বজনদের।
এদিকে হাসপাতাল চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সারি থাকলেও এখন যোগ হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটো। হাসপাতালের ভেতরে কয়েক স্তরে রাখা হয় এসব অটো। ফলে রোগীদের চলাচলে ঘটছে বিঘ্ন।
তবে আশার খবর, সম্প্রতি ৫০০ শয্যা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। গত ১৬ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ-২ এর ব্যয় ব্যবস্থাপনা শাখা-৬ এর উপসচিব শুক্লা সরকার স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
সার্বিক বিষয়ে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবির আগামীর সময়কে জানান, জনবল সংকটের কারণে কিছু সেবায় বিঘ্ন ঘটছে। তবে এর মাঝেও আমরা সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিতে কাজ করছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার অচল যন্ত্রপাতি সচল করতেও কাজ চলছে।
দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, হাসপাতালে আউটসোর্সিং কর্মীদের মধ্যে কয়েকজন এসবের সঙ্গে জড়িত। আমরা তাদের চিহ্নিত করছি। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতাল চত্বরে অবৈধ যানবাহন যাতে না থাকে এজন্য আনসার সদস্যদের অভহিত করা হয়েছে। আশা করি এ সমস্যা থাকবে না, ভাষ্য এ কর্তার।
৫০০ শয্যার জনবল নেই তাহলে এক হাজার শয্যা চলবে কিভাবে চলবে এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক জানান, ইতোমধ্যে আমরা জনবল কাঠামোর তালিকা প্রস্তুত করেছি। তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আশা করছি এক হাজার শয্যা চালানোর মতো আমরা লোকবল পাবো। তবে এটি সময়সাপেক্ষ বিষয়।




