অসন্তোষজনক পরীক্ষা পদ্ধতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র প্রায় একই ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতির ধারা যুগ যুগ ধরে চালু রয়েছে। কোথাও কোথাও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষাও নেওয়া হয়। মূলত স্কুলপর্যায়ে প্রতিটি শ্রেণিতে বছরে দুটি অথবা তিনটি পরীক্ষা নেওয়া হয়, যার ভিত্তিতে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া নির্ভর করে। দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির শেষে দুটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ নিয়ে দেশে সরকার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, মিডিয়াসহ নানা পক্ষই বেশ তৎপর থাকে। গোটা দেশে প্রায় সবাই জানে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা কখন শুরু এবং শেষ হয়। দেশে একসময় চারটি শিক্ষা বোর্ড ছিল, এখন তা ১১টিতে উন্নীত হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্নাতক, স্নাতক সম্মান ও মাস্টার্স পরীক্ষাও বোর্ড পরীক্ষার মতোই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগভিত্তিক নিজ নিজ সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার নিয়ম হয়েছে গুচ্ছ এবং একক পদ্ধতিতে।
পরীক্ষা নামক বিষয়টি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমনভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, যা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কারণ নেই। কেননা, এখানে পরীক্ষা মানেই হচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী শিক্ষার্থীদের মূলত মুখস্থনির্ভর প্রশ্নের উত্তর লেখার চাপ গ্রহণ করতে হয়। এটি উন্নত কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন নেই বললেই চলে। আমাদের দেশে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের দেড় থেকে দুই ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়।
অভিভাবকরা পরীক্ষায় তার সন্তান কত নম্বর পেয়েছে, সেটিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এর জন্য প্রয়োজনে অভিভাবকরা জানুয়ারি মাস থেকে পরবর্তী ডিসেম্বর পর্যন্ত সন্তানকে কয়েকজন শিক্ষকের কাছে ব্যাচে কিংবা গৃহশিক্ষক রেখে পড়াতে কসুর করেন না। পরীক্ষায় সন্তান যেকোনো মূল্যে পাস, জিপিএ ৫, অনেকের গোল্ডেন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও সন্তানের ওপর ব্যাপকভাবে রয়েছে। মোটকথা, শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম শ্রেণি থেকে সর্বশেষ পরীক্ষা পর্যন্ত ভালো ফলাফলের জন্য কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, গাইড বই ইত্যাদি মুখ্য হয়ে উঠেছে। সন্তান কী শিখল, জানল বা বুঝল— সেটি খুব বেশি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। বেশিরভাগ অভিভাবকের কাছে পরীক্ষায় সন্তানের ‘ভালো’ ফলাফল যেন একটি সামাজিক ‘মর্যাদার’ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে! এক কথায় পরীক্ষার এই চাপ শিশু শ্রেণি থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। কিন্তু শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে প্রথাগত এই বাড়বাড়ন্ত লিখিত পরীক্ষা থেকে বের হয়ে আসা এবং সেই স্থানে উন্নত দুনিয়ায় অনুসৃত আধুনিক মেধা মূল্যায়নের নিয়মগুলো গ্রহণ করতে মানসিক উদারতা দেখা যাচ্ছে না। এর প্রমাণ নিকট অতীতে কয়েকবার এ নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা হলেও, নানা মহলের অসহযোগিতা ও সমালোচনায় তা বন্ধ হতে দেখা গেছে। এর কারণ হচ্ছে— আমাদের শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষিত সমাজ বলতে যাদের বোঝানো হয়ে থাকে, তারাও লিখিত পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমেই নানা শিক্ষা সনদ লাভ করেছেন। তাই তারা নতুন কোনো পদ্ধতি কিংবা চিন্তা অথবা সৃজনশীলতাকে শিক্ষাক্ষেত্রে সাদরে গ্রহণ করতে পারেন না। নিজেদের সন্তানের মেধার ওপর আস্থা স্থাপন না করে বরং নতুন নতুন পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হলে তাদের সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন অথবা ফলাফলের বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন— এমন আশঙ্কা করেন। এর প্রধান কারণ তারা বছর শেষে, পাবলিক পরীক্ষার শেষে এবং সর্বশেষ শিক্ষা সনদ পরীক্ষায় ভালো ফলাফল দেখতে চান। দীর্ঘ এই অভ্যাস এবং বিশ্বাসের সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম কিংবা কাটিয়ে ওঠার কোনো চিন্তা তারা সহজে গ্রহণ করতে পারেন না। এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও রয়েছে চরম বৈষম্য ও নানা সংকট।
আমরা রাতারাতি বা খুব স্বল্প সময়ে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারব না। তাই পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পদ্ধতিও উন্নত করতে সময়, প্রস্তুতি, পরিকল্পনা প্রণয়ন, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক সর্বস্তরে নিয়োগ দেওয়ার মতো করে তৈরি করতে হয়
উন্নত দুনিয়ার সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মাত্র একটি অনুষঙ্গ হচ্ছে পরীক্ষা তথা মেধার যাচাই। উন্নত দুনিয়ায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো লিখিত পরীক্ষা নেই। চতুর্থ পরবর্তী শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শ্রেণি পাঠের উপস্থিতি ৮৫ শতাংশের ওপরে, শ্রেণিকক্ষেই পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে থাকে আদান-প্রদানমূলক আলোচনা-পর্যালোচনা, গ্রুপভিত্তিক আলোচনা, প্রায়োগিক উদাহরণসহ নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তির বিকাশ, সৃজনশীলতার উদাহরণ এবং প্রকাশ করার দক্ষতা প্রদান নিয়মিত বিষয় হিসেবে পরিবিক্ষিত হয়। শিক্ষকরা প্রথম শ্রেণি থেকেই সব শিশুর প্রতি সমানভাবে দক্ষতা ও পাঠদানে সচেষ্ট থাকেন, প্রতিটি শিশুই একে অপরের থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য। শ্রেণি পাঠ, শ্রেণি কর্ম যেন শিশুর জীবনঘনিষ্ঠ হয়, আনন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়— সে ধরনের পঠন-পাঠনের ভেতর দিয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শুরু থেকে গড়ে তোলার সুযোগ পায়। শিক্ষার্থীদের নম্বরের বৈষম্যের শিকার হতে হয় না। ওপরের শ্রেণি পাঠের ওপর নানা ধরনের কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট যা শুধু অভ্যন্তরীণ শিক্ষকরাই নয়, বহিঃশিক্ষক দিয়েও নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। সব শিক্ষার্থীকেই মানসম্মত পাঠদান এবং মূল্যায়নের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন উপায়ের মাধ্যমে শিক্ষাজীবন সফল হওয়ার ব্যবস্থা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করে থাকে। গাইড বই, কোচিং কিংবা ব্যাচভিত্তিক পড়ার কোনো ধারণা সেসব দেশে নেই।
আমরা রাতারাতি বা খুব স্বল্প সময়ে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারব না। তাই পরীক্ষা বা মূল্যায়ন পদ্ধতিও উন্নত করতে সময়, প্রস্তুতি, পরিকল্পনা প্রণয়ন, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক সর্বস্তরে নিয়োগ দেওয়ার মতো করে তৈরি করতে হয়। অভিভাবকদের মধ্যেও দুনিয়ার অভিজ্ঞতা এবং উদাহরণগুলো তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ করতে হবে। অবশ্যই গোটা শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীদের বয়স, শ্রেণি এবং স্তর অনুযায়ী প্রণয়ন করা আবশ্যক। শিক্ষাবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী শিক্ষক অবশ্যই নিয়োগ দানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা সহনশীলতার শিশুতোষ ও শিক্ষাবান্ধব হতেই হবে। উন্নত দুনিয়ায় শিক্ষক নিয়োগে উপর্যুক্ত গুণাগুণের ক্ষেত্রে কোনো শৈথিল্য প্রদর্শন করা হয় না। শিক্ষকই পারেন সব ধরনের ভয়ভীতি থেকে শিশুদের বের করে আনতে, সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী ভবিষ্যৎ মেধাবী দক্ষ নাগরিক হিসেবে তাদের গড়ে তুলতে। আমরা বোধহয় এক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছি। এজন্যই প্রথাগত শিক্ষা, বিশ্বাস ও অনাধুনিকতা দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি সম্ভব নয়। এর জন্য শিক্ষাবিজ্ঞানে শিক্ষিত শিক্ষক অবশ্যই তৈরি করতে হবে। তাহলেই প্রত্যাশিত শিক্ষার্থী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শতভাগ তৈরি হবেই।
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক





