বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন কেন্দ্র হতে চায় তুরস্ক

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো বিকল্প লজিস্টিক করিডরের খোঁজ করছে। প্রায় দুই দশক ধরে পরিবহন অবকাঠামো ও লজিস্টিক ব্যবস্থার বৈচিত্র্য বাড়ানোর উদ্যোগের কারণে তুরস্ক এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।
তুরস্কভিত্তিক ওমসান লজিস্টিকসের চেয়ারম্যান এরগুন আরিবুর্নু আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও আমেরিকার সংযোগস্থলে অবস্থান করায় তুরস্কের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। শক্তিশালী অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য দেশটি নির্ভরযোগ্য গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।’
আরিবুর্নুর মতে, লজিস্টিকস এখন আর শুধু পণ্য পরিবহনের বিষয় নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
তিনি বলেন, ‘তুরস্ক যদি এই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। আজ হরমুজ প্রণালি, আগামীকাল সুয়েজ বা পানামা খালেও একই ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ এই পথগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাণিজ্যে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে অনেক দেশই উদ্বিগ্ন।’
আরিবুর্নু জানান, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো যখন বিকল্প রুট খুঁজছে, তখন তুরস্ক ২০০৭ সাল থেকেই এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। মিডল করিডর, জাঙ্গেজুর করিডর এবং সম্প্রতি আবার আলোচনায় আসা হেজাজ রেলপথের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে দেশটি পরিবহন নেটওয়ার্কের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘লজিস্টিক হাব হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তুরস্ক রেলপথে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। বিভিন্ন বন্দরে আসা পণ্য রেলপথের মাধ্যমে আফ্রিকাসহ বিস্তৃত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তুর্কি রাষ্ট্র ও ককেশাস অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ জোরদারে দোরতইয়োল-হাসা রেলপথ ও মহাসড়ক টানেল নির্মাণেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চীনের পণ্য ইস্কান্দেরুন বন্দরে এনে সেখান থেকে সমুদ্র ও রেলপথে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পাঠানো সম্ভব হবে।’
আরিবুর্নুর ভাষ্য, বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে হয়। এ কারণে ওমসানের মূল প্রতিষ্ঠান ওইয়াক লজিস্টিকস গ্রুপ বন্দর ও সমুদ্রপথভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে মরক্কোর তানজের মেড বন্দরে তাদের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
টার্কিশ এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘তানজের মেড বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর। ভূমধ্যসাগরে এর কৌশলগত অবস্থান ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করেছে। এই বন্দরে প্রথম লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা কার্যক্রম শুরু করি এবং গুদাম স্থাপন করি। বর্তমানে মরক্কো ও আফ্রিকাজুড়ে অটোমোটিভ লজিস্টিকস খাতে আমাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে।’
তার মতে, মরক্কোকে কেন্দ্র করে আফ্রিকার বাজারে প্রবেশের কৌশল নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তার ভাষায়, লজিস্টিকস একটি সমন্বিত সেবা। শুধু তুরস্কে বিনিয়োগ করেই এই ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব। তবে আমাদের লক্ষ্য বৈশ্বিক পরিসরে বিস্তার লাভ করা।
তিনি বলেন, আগামী এক দশকে বৈশ্বিক লজিস্টিক খাতের বাণিজ্যিক পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে। দক্ষ মানবসম্পদের কারণে তুরস্ক আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। তবে সময়মতো অবকাঠামো প্রকল্প শেষ করতে না পারা এবং দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে তুরস্ক ইউরোপ, ককেশাস, তুর্কি রাষ্ট্র এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি




