দূষণের শুরু আমাদের ঘর থেকেই
- প্লাস্টিকের দখলে দৈনন্দিন জীবন
- শিশুরাও বড় হচ্ছে প্লাস্টিকের ভেতর
- ঘরের ছোট অভ্যাসে পরিবেশের বড় ক্ষতি
- শিশুরা পরিবেশ শিক্ষা পেলেও অভ্যাসে বদল আসছে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পরিবেশ দূষণের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধোঁয়ায় ভরা ঢাকা শহর, ময়লায় ভরা ড্রেন, দূষিত নদী, কেটে ফেলা বন আর জলাশয়ে জমে থাকা প্লাস্টিকের স্তূপের দৃশ্য। এসব দৃশ্য আমাদের ব্যথিত করে। আমরা প্রতিবাদ করি, সভা করি, সেমিনারে কথা বলি, মানববন্ধনে দাঁড়াই। কিন্তু খুব সহজ একটি সত্য আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। পরিবেশ দূষণের বড় একটি অংশ শুরু হচ্ছে আমাদের ঘর থেকেই।
ঘরের ভেতরের বাতাস, রান্নার ধোঁয়া, রাসায়নিকযুক্ত ক্লিনার, সুগন্ধি, প্লাস্টিকের পাত্র, একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন, খাবারের মোড়ক, পুরোনো ইলেকট্রনিক সামগ্রী, সবই পরিবেশ দূষণের সঙ্গে যুক্ত। বাইরের দূষণ আমরা চোখে দেখি বলে তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হই। কিন্তু ঘরের ভেতরের দূষণ চোখে কম পড়ে বলে সেটিকে গুরুত্ব দিই না। অথচ প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই ধীরে ধীরে আমাদের ঘর, সমাজ ও প্রকৃতিকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই প্লাস্টিকের সঙ্গে আমাদের দিনের শুরু। টুথব্রাশ, টুথপেস্টের টিউব, শ্যাম্পুর বোতল, সাবান ও প্রসাধনীর মোড়ক, চিরুনি, রেজর, লোশন বা ক্রিমের প্যাকেট, সব জায়গায় প্লাস্টিক। রান্নাঘরেও একই চিত্র। কোমল পানীয়ের বোতল, খাবারের প্যাকেট, চিপস-বিস্কুটের মোড়ক, দুধ-দই-জুসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের টিফিন বক্স, খাবার রাখার পাত্র, চামচ, প্লেট, গ্লাস, স্ট্র, মগ, মসলা-তেল-সসের বোতল, ফ্রিজে খাবার রাখার পলিব্যাগ, সবকিছু মিলিয়ে ঘর যেন নীরবে প্লাস্টিকের দখলে চলে গেছে।
আমাদের শিশুরা স্কুলে পরিবেশ নিয়ে রচনা লেখে, ছবি আঁকে, বিতর্ক করে। তারা বইয়ে পড়ে গাছ লাগাতে হবে, নদী বাঁচাতে হবে, প্লাস্টিক কমাতে হবে। কিন্তু বাস্তব জীবনে তারা বড় হচ্ছে প্লাস্টিকের ভেতর। স্কুলে যাওয়ার সময় তাদের হাতে থাকে প্লাস্টিকের বোতল, টিফিন থাকে প্লাস্টিকের বক্সে, খাবার থাকে মোড়কে, খেলনাও অধিকাংশ সময় প্লাস্টিকের। ফলে পরিবেশ শিক্ষা অনেক সময় বইয়ের পাতাতেই আটকে থাকে, অভ্যাসে পৌঁছায় না। পরিবেশ সচেতনতা মুখস্থ করলে সমাজ বদলায় না, জীবনযাপনে ঢুকলে তবেই পরিবর্তন আসে।
বাজারে গেলে এই নির্ভরতা আরও স্পষ্ট হয়। মাছ, মাংস, ফল, সবজি, মুদি পণ্য, প্রায় সবকিছুই আমরা পলিথিন ব্যাগে ভরে নিয়ে আসি। অনলাইনে পণ্য কিনলে আসে মোড়ক, বাবল র্যাপ, কুরিয়ার প্যাকেট, প্লাস্টিকের দড়ি ও টেপ। ঘরের বালতি, মগ, ডাস্টবিন, কাপড় রাখার ঝুড়ি, প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল, স্টোরেজ বক্স, হ্যাঙ্গার, সুইচবোর্ড ও বৈদ্যুতিক প্লাগের অংশও প্লাস্টিকের তৈরি। বুঝে না বুঝে আমরা প্রতিদিন প্লাস্টিকের বড় এক বৃত্তের ভেতর বাস করছি।
সবচেয়ে বড় বিপদ তৈরি করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক। এগুলো আমরা অল্প সময় ব্যবহার করি, তারপর ফেলে দিই। কিন্তু ব্যবহার শেষ হলেও এগুলোর অস্তিত্ব শেষ হয় না। ড্রেনে পড়ে পানি চলাচল আটকে দেয়, মাটিতে পড়ে মাটির স্বাভাবিক গুণ নষ্ট করে, নদী ও খালে গিয়ে জলজ প্রাণীর ক্ষতি করে। সময়ের সঙ্গে এগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়, যাকে বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক। এই ক্ষুদ্র কণা পানি, মাটি, মাছ, খাদ্যশস্য এমনকি মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে।
উদ্বেগের জায়গা হলো, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমরা আর সেটিকে সমস্যা হিসেবে দেখি না। বাজার থেকে পলিথিনে মাছ আনা, ফ্রিজে পলিব্যাগে খাবার রাখা, শিশুর হাতে প্লাস্টিকের পানির বোতল তুলে দেওয়া, স্কুলের টিফিন প্লাস্টিকের বক্সে পাঠানো, এসব কাজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। অথচ এই ছোট অভ্যাসগুলোই বড় পরিবেশ সংকট তৈরি করছে।
সমাধানও তাই শুরু হতে পারে ঘর থেকেই। প্রথম কাজ হলো অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক কমানো। বাজারে গেলে কাপড়ের ব্যাগ সঙ্গে নেওয়া, পলিথিন ব্যাগ না নেওয়ার চেষ্টা করা, একবার ব্যবহারযোগ্য পানির বোতলের বদলে টেকসই বোতল ব্যবহার করা, প্লাস্টিকের স্ট্র, কাপ, প্লেট ও চামচ এড়িয়ে চলা, খাবার সংরক্ষণে নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী পাত্র ব্যবহার করা, অনলাইন পণ্যের অপ্রয়োজনীয় মোড়ক কমানোর দাবি তোলা, এসব ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।
ঘরের বর্জ্য আলাদা করাও জরুরি। পচনশীল বর্জ্য, প্লাস্টিক, কাচ, ধাতু ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য একসঙ্গে ফেললে পুনর্ব্যবহার কঠিন হয়ে যায়। পুরোনো মোবাইল, চার্জার, ব্যাটারি, তার, বাতি বা ভাঙা বৈদ্যুতিক সামগ্রী সাধারণ ময়লার সঙ্গে ফেললে তা মাটি ও পানির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ঘরের ভেতরের বাতাস নিয়েও ভাবা দরকার। রান্নার ধোঁয়া, অতিরিক্ত সুগন্ধি, তীব্র রাসায়নিকযুক্ত ক্লিনার, বাতাস চলাচলের অভাব, এসব স্বাস্থ্য ও পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো, প্রয়োজনের বেশি স্প্রে না করা, রান্নাঘর পরিষ্কার ও বায়ু চলাচলযোগ্য রাখা, এগুলো সাধারণ অভ্যাস হলেও এর প্রভাব বড়।
পরিবেশ রক্ষা কোনো দূরের বিষয় নয়। এটি শুধু বন, নদী, পাহাড়, সমুদ্র বা রাস্তার ময়লা নিয়ে ভাবার বিষয় নয়। পরিবেশ আমাদের ঘর, রান্নাঘর, বাজারের ব্যাগ, শিশুর পানির বোতল, টিফিন বক্স, ফ্রিজের পলিব্যাগ, প্রসাধনীর প্যাকেট, আবর্জনার ঝুড়ি, সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত। আমরা যা কিনি, ব্যবহার করি এবং ফেলে দিই, প্রতিটি সিদ্ধান্ত পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে।
বড় পরিবর্তন সব সময় বড় মঞ্চ থেকে শুরু হয় না। অনেক সময় তা শুরু হয় রান্নাঘরের ছোট সিদ্ধান্ত থেকে, বাজারের ব্যাগ থেকে, শিশুর টিফিন বক্স থেকে, ঘরের আবর্জনা আলাদা করার অভ্যাস থেকে। আমরা যদি সত্যিই পরিবেশ বাঁচাতে চাই, তাহলে শুধু বাইরে তাকালে চলবে না। নিজের ঘরেও তাকাতে হবে। যেদিন আমরা বুঝব, পরিবেশ শুধু পৃথিবীর নয়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনেরও প্রশ্ন, সেদিন থেকেই বদল শুরু হবে। আর সেই বদলের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে খুব সহজ একটি সিদ্ধান্ত, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার নয়। সচেতন জীবনযাপনই হোক আমাদের নতুন অভ্যাস।




