সেন্ট মার্টিন
ফিরছে জীববৈচিত্র্য, দ্বীপবাসী জীবিকার সংকটে
- গত দুই দশকে প্রবাল, কচ্ছপ ও পরিযায়ী পাখির আবাস সংকুচিত হয়েছে: রেজা খান
- বাসিন্দাদের বিকল্প জীবিকা তৈরি করতে হবে: মোহাম্মদ আল-আমিন
- পরিবেশগত অবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক: মনিরুল এইচ খান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে দ্বীপবাসীর আয়ের প্রধান উৎস পর্যটনখাত আর মাছ ধরা। দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ২০২৪ সাল থেকে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। এতে পরিবেশগত অবস্থা ফিরতে শুরু করলেও আয় কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন বাসিন্দারা। এদিকে মাছও কমে গেছে আশেপাশের সমুদ্রসীমায়।
টেকনাফ থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গপোসাগরে অবস্থিত সেন্ট মার্টিন। ৮ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস। পর্যটনের চাপে অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রায় তিন শতাধিক হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ, অতিরিক্ত মানুষের আবাসের কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছিল। দ্বীপের মিঠাপানির পুকুর, গাছপালা, ঝোপঝাড় ও কেয়াগাছের প্রাকৃতিক বেষ্টনী ধ্বংস হয়েছে। নির্মাণকাজের জন্য অনেক প্রবাল ও পাথর সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে বেড়েছে উপকূলের ক্ষয় ও ঝড়ের ঝুঁকি। অতিরিক্ত শিকারের ফলে আশপাশের সমুদ্র এখন প্রায় মাছশূন্য।
দ্বীপটি রক্ষায় ২০২৪ সাল থেকে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। নীতিমালা অনুযায়ী, পর্যটকরা কেবল নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি— বছরে এই তিন মাস দ্বীপটিতে যেতে পারবেন; তাও প্রতিদিন দুই হাজার জন করে। নভেম্বর মাসে রাতে থাকা যাবে না।
দ্বীপের বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের আয়-রোজগার হইত মানুষজন বেড়াইতে আইলে। কিন্তু গত ২৭ মাসে আমরা মাত্র চার মাস এই আয়ের সুযোগ পাইছি।’
আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আয়াস (২৫) জানান, বাবার মুদি দোকান আর নিজের আয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। তবে পর্যটক সীমিতিকরণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপের কারণে আয় কমতে থাকে তার পরিবারের। মাত্র তিন মাসের আয় দিয়েই পুরো বছর চলতে হয়।
সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ দেখা দেয় স্থানীয় ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে। সেন্ট মার্টিনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেন, ‘পর্যটন ও মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সেন্ট মার্টিনের মানুষের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু সরকারি সহায়তা যেমন— চাল, ভিজিএফ বা জেলেদের-সহায়তা না থাকলে অনেক মানুষ হয়তো খেতেও পারত না।’
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান আগামীর সময়কে বলেন, ‘গত দুই দশকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিগত সরকার সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এসব পদক্ষেপ আংশিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও বাস্তবায়নের দুর্বলতা, স্থানীয় জনগণের বিকল্প জীবিকার সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।’
সেন্ট মার্টিন নিয়ে গবেষণা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও ডিন মোহাম্মদ আল-আমিন। তিনি বলেন, সেন্ট মার্টিন মূলত কোরাল বা প্রবাল দিয়ে তৈরি একটি ছোট দ্বীপ। কিন্তু এখন সেখানে আগের মতো জীবন্ত কোরাল খুব বেশি দেখা যায় না। ধীরে ধীরে দ্বীপটি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
‘এটার পেছনে তিনটি বড় কারণ— একটি হলো মানুষের বসতি ও পর্যটনের বিস্তার; আরেকটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। আগে এখানে তেমন বসতি ছিল না, কিন্তু এখন এটি বড় একটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও দ্বীপটির ক্ষয় ত্বরান্বিত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি দায়ী মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড। এ কারণেই সরকার এটিকে একটি হেরিটেজ এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করেছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খানের মতে, সেন্ট মার্টিনের পরিবেশগত অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। যদিও সাম্প্রতিক উদ্যোগের ফলে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছে। দ্বীপটি আকারে ছোট হওয়ায় এর ধারণক্ষমতা সীমিত, কিন্তু পর্যটনের চাপ এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে সেই সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম রফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানান, ‘সেন্ট মার্টিন এলাকায় পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা কার্যকর রয়েছে। নির্ধারিত আচরণবিধি মেনে ওই এলাকায় প্রবেশ করতে পারেন। ২০২৪ সাল থেকেই এই নিয়ম বহাল রয়েছে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের পর্যটনসীমিত করার পদক্ষেপের কারণে নানা গুঞ্জনও তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে প্রচারণা চলে যে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটিতে নৌ-ঘাঁটি করতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার জানিয়েছে, তাদের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই। সে সময় পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানও বলেন, এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা। এখানে ঘাঁটি করার কোনো সুযোগ নেই, আয়তনও নেই—এটা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ আগামীর সময়কে বলেছেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে কোনো আন্তর্জাতিক শক্তির সামরিক ঘাঁটি করা একটি বাস্তবতাবিবর্জিত চিন্তা; সেন্ট মার্টিনের সেই ভৌগোলিক সামর্থ্যই নেই এবং কোনো দেশ এটি বিশেষভাবে পেতে চায়—এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ বা পরিকল্পনা কোথাও পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এই আলোচনার সূত্রপাত প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, অনেক সময় নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে কিংবা প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে কোণঠাসা করতে নানা ধরনের অনুমাননির্ভর এবং বাস্তবতাহীন কথাবার্তা বলা হয়।
১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার ও টেকনাফ সৈকতসহ দেশের ছয়টি এলাকাকে সংকটাপন্ন ঘোষণা করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এরপর ২০১৮ সালে দেশের একমাত্র এই প্রবাল দ্বীপে পর্যটকদের রাত্রিকালীন অবস্থান নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়। দ্বীপটির অধিবাসীদেরও ধাপেধাপে মূল ভূখণ্ডে সরিয়ে আনারও পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে হোটেল-মোটেলসহ সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার জন্য বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনাও প্রণয়ন করেছিল সে সময়কার সরকার।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।




