‘চোখে ভাসছে ছেলে দুটি, কীভাবে ভুলি’

হারুন ও ইশরাত দম্পতির যমজ সন্তান ফাহিম ও নোমান মারা গেছে হামে আক্রান্ত হয়েছে। ছবি: পরিবার থেকে পাওয়া
‘আমার তো কোনো সম্পদ নেই যে বিক্রি করে টাকা জোগাড় করব। ছয় লাখ টাকা ধার-কর্জ করেছি। বন্ধু-বান্ধব, কিস্তি সুদ কোনটা বাদ নেই। তারপরও বাচ্চা দুটিকে বাঁচাতে পারলে মনকে বোঝাতে পারতাম। এই ১৬ তারিখ এলে তাদের ১৪ মাস বয়স হতো।’
হারুনুর রশিদকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা স্বজনদের কারও নেই। সবাই কেবল শুনে যাচ্ছে। সুনসান নীরবতা ঘর জুড়ে। মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া তাকিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা হারুন যমজ দুই ছেলেকে হারিয়ে নিঃস্ব হাতে বাড়ি ফিরেছেন বুধবার। হামে ভুগছিল দুজন। মঙ্গলবার রাতে ঢাকার নারায়ণগঞ্জ নবজাতক হাসপাতালে তার যমজ ছেলের দ্বিতীয় জন আবদুল্লাহ আল ফাহিম মারা যায়।
এর আগে ২২ মে আবদুল্লাহ আল নোমান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে মারা যায়। গত বছরের ১৬ এপ্রিল দুই ছেলের জন্ম হয়। বছর না ঘুরতেই যমজ বাচ্চা দুটিকে নিয়ে হারুন ও স্ত্রী ইশরাত জাহানের যুদ্ধটা শুরুটা হয় মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে।
হাসপাতাল থেকে বাড়ি আবার হাসপাতাল। ৮ মার্চ ফাহিমের শ্বাসকষ্টসহ জ্বর দেখা দেয়। ভর্তি করা হয় চমেক হাসপাতালে। হাম উপসর্গের চিকিৎসা চলছিল। পরে তার হাম শনাক্ত হয়। দুই সপ্তাহ পর একটু সুস্থ হলে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ফের শ্বাসকষ্ট শুরু হলে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফাহিমের পাশাপাশি উপসর্গ দেখা দেয় নোমানেরও। এপ্রিলের মাঝামাঝিতে তাকেও চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
নোমানকে দাফন করে ফাহিমকে নিয়ে ঢাকায় ছোটেন হারুন। উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করেন ফাহিমকে। সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জ নবজাতক হাসপাতালের আইসিইউতে। শেষ রক্ষা হয়নি। গতকাল বুধবার নিথর ফাহিমকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন তারা। দুজনের চলে যাওয়ার মাঝে ব্যবধান ১২দিন। রাতেই জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
হারুণ আগামীর সময়কে জানান, ‘আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি। তিন মাস দোকান বন্ধ। আমার জমিজমা সোনাদানি নেই যে বিক্রি করে টাকা জোগাড় করব। ধার-দেনা করে বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। পারিনি। ছেলেগুলোকে টিকা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু টিকা পাইনি। তাই দিতে পারিনি।’
দুধের দুই ছেলেকে হারিয়ে ইশরাত জাহান শোকে যেন পাথর। দুই ভাইয়ের জন্য কাঁদছে ছয় বছরের তাবাসসুম। আধো আধো স্বরে ছেলে দুটি একটু একটু শব্দ করত। হারুন যেন এখনো সেই ডাক শুনতে পাচ্ছেন, ‘চোখে ভাসছে আমার ছেলে দুটি, কীভাবে ভুলি।’
হারুন, ইশরাত, তাবাসসুমকে কে সান্ত্বনা দেবে! এই দুই যমজ শিশুর জন্য যে পাড়া প্রতিবেশীরাও এখন কাঁদছে।




