নাবিহার প্রিয় নদী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শহর থেকে গ্রামে এসে যা দেখে, খুব অবাক হয়ে যায় এক আদুরে সোনা। বাবার কাছে করে নানা আবদার। সেই সোনাপাখি ও তার বাবার গল্প লিখেছেন নদীর বন্ধু ইমন চৌধুরী
‘ওই বাড়িতে কে থাকে, বাবা?’
‘কোন বাড়িতে, মা?’
‘আরে, ওই বাড়িটা?’ নাবিহা খানিকটা বিরক্ত হলো এবার। আঙুল তুলে দূরে বিন্দুর মতো একটা বাড়ি দেখিয়ে দিল সে।
মাহবুব হাসান এতক্ষণে বুঝতে পারলেন। মেয়ের গালে গাল ঠেকিয়ে বললেন, ‘ওই বাড়িটা একটা কৃষকের বাড়ি, মা।’
নাবিহাদের গ্রামের বাড়ির পরপরই বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। মাঠ পেরিয়ে অনেক দূরে বিন্দুর মতো একটা বাড়ি। বাড়িটা নদীর ধারে।
‘কৃষক মানে কী, বাবা?’ নাবিহা তার ছোট্ট চশমার ফ্রেমটা ছুঁয়ে নতুন প্রশ্ন করল।
‘যারা জমিতে ফসল চাষ করেন, তাদের বলে কৃষক।’
‘ফসল মানে কী?’ নাবিহার কৌতূহলের অন্ত নেই।
‘ফসল মানে আমরা যে ভাত খাই, ডাল খাই— এইসবকে বলে ফসল।’
‘আমাকে বাড়িটার কাছে নিয়ে যাবে, বাবা?’ নাবিহার চোখ দুটি হঠাৎ চকচক করে ওঠে। ওদের ঢাকার বাসায় ফসলের মাঠ দেখা যায় না। দিগন্ত ছোঁয়া আকাশ বা কৃষকের বাড়িও দেখা যায় না। দেখা যায় না নদী, ফড়িং বা মিষ্টি কোনো পাখি। তাই মা-বাবার সঙ্গে ঈদের ছুটিতে বাড়ি এলে নাবিহা অবাক হয়ে দেখে চারপাশের সবকিছু।
মাহবুব হাসান মেয়ের সামনে মাথা নামিয়ে নরম গলায় বললেন, ‘চলো, আমরা কৃষকের বাড়িটা দেখতে যাই। পাশে একটা নদীও আছে। আমরা আজ নদীটাও দেখব।’
‘সত্যি!’ নাবিহার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস।
‘হুম, সত্যি!’
‘একটু দাঁড়াও বাবা, আমার ব্যাগটা নিয়ে আসি।’ বলেই দৌড়ে ঘরের ভেতর চলে গেল নাবিহা। বাড়ি বা বাসার বাইরে কোথাও গেলে প্রিয় ব্যাগটা সঙ্গে রাখে সে। ব্যাগের ভেতর রাজ্যের জিনিস! একটু বাদেই ব্যাগটা নিয়ে ফিরে এলো সে।
মাহবুব হাসান মেয়ের হাত ধরে বললেন, ‘আচ্ছা, নদী মানে কী, বলো তো?’
বলতে বলতে বাড়ি ছেড়ে ফসলের মাঠে নেমে এলো বাবা-মেয়ে। শুকনো মাঠ। কদিন আগেই মাঠ থেকে ফসল কেটে নিয়েছেন কৃষক।
নাবিহা খানিকটা ফিসফিস করে বলল, ‘নদী মানে রিভার। নদীতে অনেক পানি থাকে, মাছ থাকে; আর থাকে নৌকা।’
‘ভেরি গুড। তুমি তো দেখছি সবই জানো।’
মাহবুব হাসান মেয়ের হাত ধরে এগিয়ে যান সামনের দিকে। দূর থেকে বিন্দুর মতো দেখতে কৃষকের বাড়িটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। বড় হতে হতে একসময় দুজনের ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায়। বাড়িটা পেছনে রেখে বাবার সঙ্গে আরও কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই নাবিহা অবাক চোখে দেখে ছোট্ট একটা নদী। এঁকেবেঁকে চলে গেছে যেন দূরের কোনো দেশে।
নাবিহা চিৎকার করে বলল, ‘ওয়াও! এটা নদী?’
‘হুম, নদী। এই নদীটার নাম সিলোনিয়া নদী।’
‘হি হি হি... নদীরও কি মানুষের মতো নাম থাকে, বাবা?’
‘হুম, থাকে তো। নদীরও নাম থাকে। পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, মধুমতী, কুশিয়ারা— এগুলো সব নদীর নাম।’
নাবিহার চোখে বিস্ময়। সিলোনিয়ার দুই পাড়ে সারি সারি তালগাছ। তালগাছের পাতায় পাতায় দুলছে বাবুই পাখির বাসা। একটু দূরে দূরে একটা-দুইটা কৃষকের বাড়ি। পাখির কিচিরমিচির শব্দ। নদীর জলে ভাসছে ছোট্ট একটা নৌকা।
নাবিহা মুগ্ধ হয়ে বলল, ‘বাবা, এই নদীটা অনেক সুন্দর।’
‘হুম, সব নদীই সুন্দর মা। তুমি যখন অনেক বড় হবে, আমাদের দেশটা ঘুরে ঘুরে অনেক নদী দেখতে পাবে।’
‘আরও বড় বড় নদী?’
‘হুম, আরও বড় বড় নদী।’
‘আচ্ছা বাবা, এই নদীটা ঢাকায় নেই কেন?’
‘এই নদীটার এখানেই বাড়ি। ঢাকায়ও তো নদী আছে— বুড়িগঙ্গা নদী।’
‘এই নদীটাই বেশি সুন্দর। বুড়িগঙ্গায় ময়লা। এই নদীটা আমি ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই।’
মাহবুব হাসান মাথা চুলকে বললেন, ‘কিন্তু নদী তো সঙ্গে করে কোথাও নেওয়া যায় না, মা।’
নাবিহা জবাব না দিয়ে ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা পানির বোতল বের করে আনল। বোতলের পানিটুকু একচুমুকে শেষ করে বলল, ‘বাবা, এই বোতলে নদী থেকে একটু পানি এনে দাও। এই পানি আমি ঢাকায় নিয়ে যাব। তখন মনে হবে, নদীটাও আমাদের সঙ্গে আছে।’
মাহবুব হাসান অবাক চোখে মেয়েকে দেখলেন। তারপর হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে মা, তুমি দাঁড়াও, আমি পানি নিয়ে আসছি।’
পানি নিয়ে ফিরতেই বাবার কাছ থেকে বোতলটা কেড়ে নিয়ে বুকের কাছে রেখে নাবিহা বলল, ‘নদীটাও এখন আমাদের সঙ্গে ঢাকায় যাবে।’
বলতে বলতে আকাশের দিকে তাকাল সে। মাথার ওপর বিশাল আকাশটা দেখে মনে হলো, আকাশটাও যদি নদীর মতো ধরা যেত! তবে একটুকরো আকাশও সে নিয়ে যেত ঢাকার বাসায়!





