মারা যাওয়াদের ৫৪ শতাংশই নারী

ফাইল ছবি
রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড। ঢুকেই থমকে দাঁড়াতে হয়। চারদিকে রোগী আর রোগী। ৩৮টি শয্যা থাকলেও চিকিৎসা চলছিল ৮৩ জনের। বেডে জায়গা না পেয়ে মেঝেতেই শুয়ে অনেকে। বাতাসে গোঙানির শব্দ আর কান্না। আবার কেউবা সুস্থ হয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাড়ি ফেরার। তবে অধিকাংশের চোখেমুখেই আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছাপ। এ চিত্র গতকাল শুক্রবার বিকালের। হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগীর বড় একটি অংশ নারী।
নারীদের ডেঙ্গু আক্রান্তের এ চিত্র শুধু মুগদা হাসপাতালের নয়। পুরো দেশের গত চার বছরের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে আতঙ্কের এক চিত্র। ডেঙ্গুতে মারা যাওয়াদের ৫৪ শতাংশই নারী। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে ২ হাজার ৭৪৬ জনের। এর মধ্যে নারী ১ হাজার ৪৯৪ জন। নারীদের প্রতি অবহেলা আর হাসপাতালে নিতে দেরি হওয়াকেই মৃত্যুহার বেশি হওয়ার বড় কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া অপুষ্টির কারণে নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আঘাত আসছে কর্মক্ষম বয়সে। ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সীরা মারা যাচ্ছেন বেশি।
মুগদা হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের এক পাশে ৪৭ বছর বয়সী শামীমার যন্ত্রণার দৃশ্য হৃদয় নাড়িয়ে দেয়। রাজধানীর জুরাইনের বাসিন্দা তিনি। পাঁচ দিন ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তার ছেলে সৌরভ জানালেন, মায়ের রক্তে আগে থেকেই হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম ছিল। প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা করা হলেও শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে প্রস্রাবে জটিলতা দেখা দেয়। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন শামীমা।
২০২৩ সালের ভয়াবহ ডেঙ্গু মহামারীর পরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। প্রতি বছর বর্ষা এলেই বাড়ছে সংক্রমণ, আর তার সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিলও। উদ্বেগের বিষয় হলো, গত চার বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৫৪ জনই নারী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ২ হাজার ৭৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নারী ১ হাজার ৪৯৪ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫৪ দশমিক ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষের মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৫২ জন, যা মোট মৃত্যুর ৪৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। চলতি বছরে নারী মারা গেছেন ৩২ জন ও পুরুষ মারা গেছেন ২১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের (জুলাই পর্যন্ত) সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছরই বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু দ্রুত বেড়ে যায়। ২০২৩ সালের জুনে ৩৪, জুলাইয়ে ২০৪, আগস্টে ৩৪২, সেপ্টেম্বরে ৩৯৬, অক্টোবরে ৩৫৯, নভেম্বরে ২৭৪ এবং ডিসেম্বরে ৮৭ জন মারা যান। ২০২৪ সালে জুনে ৮, জুলাইয়ে ১৪, আগস্টে ৩০, সেপ্টেম্বরে ৮৭, অক্টোবরে ১৩৫, নভেম্বরে ১৭৩ এবং ডিসেম্বরে ৮৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে জুনে ১৯, জুলাইয়ে ৪১, আগস্টে ৩৯, সেপ্টেম্বরে ৭৬, অক্টোবরে ৮০, নভেম্বরে ১০৪ এবং ডিসেম্বরে ৩১ জন মারা যান। চলতি ২০২৬ সালে জুনে ১৩ এবং জুলাইয়ে এখন পর্যন্ত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বছরের অন্যান্য মাস মিলিয়ে মারা গেছেন আরও পাঁচজন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ।
আক্রান্ত বেশি ঢাকায়, মৃত্যু বরিশালে: মান্ডা থেকে আসা ৩৮ বছর বয়সী তানিয়ার ডেঙ্গু শনাক্ত হয় চার দিন আগে। অবস্থার অবনতি হওয়ায় বৃহস্পতিবার তাকে ভর্তি করা হয় মুগদা হাসপাতালে। ২৯ নম্বর বেডে শুয়ে থাকা তানিয়া বলছিলেন, শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে উঠে বসতেও কষ্ট হয়। মাথা ঘোরে, আর যা-ই খান না কেন, মুখে তিতা লাগে।
৩৩ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন ২৬ বছর বয়সী নাইমার গল্প আরও বেদনাদায়ক। সন্তান জন্মদানের দিনই তার শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পাঁচ দিন আগে সিজারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। একদিকে প্রসূতি মায়ের চিকিৎসা, অন্যদিকে নবজাতকের যত্ন— দুই লড়াই একসঙ্গে চলছে।
ডেঙ্গু আক্রান্তের বিভাগভিত্তিক তথ্যেও দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। চার বছরে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে বরিশাল বিভাগে, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ৩২২ জন। এরপর রয়েছে ঢাকা বিভাগে ২২৭, চট্টগ্রাম বিভাগে ২১২, খুলনায় ১৭৬, রাজশাহীতে ৮৯ এবং ময়মনসিংহে ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। চার বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৫ লাখ ৩২ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৯২ হাজার ৯৯৭ জন। এরপর চট্টগ্রামে ৭৬ হাজার ২৩৯, বরিশালে ৭০ হাজার ১৭৭, খুলনায় ৫১ হাজার ২৬, রাজশাহীতে ২৯ হাজার ৪১৪, ময়মনসিংহে ১৫ হাজার ৮৮৬, রংপুরে ৮ হাজার ১৪০ এবং সিলেটে ২ হাজার ২৬১ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
প্রতি বছর জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু বাড়ার কারণ সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার আগামীর সময়কে বললেন, বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন ছোট-বড় পাত্র, ভবনের বেজমেন্ট, গাড়ি পার্কিং এলাকা ও বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। ফলে মশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণও বৃদ্ধি পায়।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক সঠিক জায়গায় প্রয়োগ হয় না উল্লেখ করে তিনি বলছিলেন, ‘রাস্তাঘাটে স্প্রে করা হলেও এডিস মশার প্রকৃত প্রজননস্থল বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানি, ছোট-বড় পাত্র কিংবা ভবনের বেজমেন্ট পর্যন্ত কীটনাশক পৌঁছায় না। প্রজননস্থল ধ্বংস হয় না বলে বাড়ে মশার বংশবৃদ্ধি।’
করণীয় সম্পর্কে কবিরুল বাশার বললেন, তথ্যভিত্তিকভাবে লার্ভিসাইড বা আইজিআর ব্যবহার করতে হবে এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে বাসাবাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজির আহমেদ বললেন, বাংলাদেশে নারীদের স্বাস্থ্যের প্রতি এখনো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থ হওয়ার পরও তাদের দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পাশাপাশি নারীদের একটি বড় অংশ অপুষ্টি বা পুষ্টিহীনতায় ভোগেন, যার ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। ফলে আক্রান্ত বেশি হয়।




