বক্তব্য প্রচারে টিভি চ্যানেলগুলোর না, ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু করল হোয়াইট হাউস

সংগৃহীত ছবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নজিরবিহীনভাবে একজোট হয়েছে বড় টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমগুলো। হোয়াইট হাউসে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ট্রাম্পের ভিডিও কভারেজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিএনএন, এবিসি, সিবিএস, ফক্স নিউজ, এনবিসিসহ প্রধান টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো। এর পরই এক প্রকার বাধ্য হয়ে হোয়াইট হাউস নিজস্ব ভিডিও ফিড চালু করেছে, সেটির নাম দিয়েছে ‘ট্রাম্প টিভি’।
সংবাদমাধ্যমগুলো বলেছে, প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে তাদের অধিকার লঙ্ঘন করেছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা তার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের চলমান বিরোধে নজিরবিহীন মাত্রার উত্তেজনা তৈরি করেছে। হোয়াইট হাউসের চ্যানেলটি ‘গুরুত্বপূর্ণ সব খবর, ঘোষণা এবং প্রশাসনের সর্বশেষ ও সেরা বিষয়গুলো এক জায়গায়’ দেখাবে বলে প্রচার করা হয়।
হোয়াইট হাউস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছে, ‘রিয়েল-টাইম আপডেট এবং সরাসরি সম্প্রচার আপনার ফোনে সরাসরি পান। কোনো বাড়তি শব্দ নয়। শুধু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর—সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে।’
কোনো প্রেসিডেন্টের সফর বা জনসমক্ষে উপস্থিতির সময় হোয়াইট হাউসের টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে না থাকা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ১৯৫০ সাল থেকে নেটওয়ার্কগুলোর ক্যামেরা প্রেসিডেন্টের কার্যক্রমের কভারেজ দিয়ে আসছে।
হোয়াইট হাউসের নতুন হেলিপ্যাড উদ্বোধনের জন্য ট্রাম্পের মধ্যাহ্নের ফিতা কাটার অনুষ্ঠান কোনো সম্প্রচারমাধ্যম কভার করেনি। হোয়াইট হাউস সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করলেও পেশাদার বুম মাইক্রোফোন ও অডিও সরঞ্জাম না থাকায় পেছনে চলতে থাকা হেলিকপ্টারের ইঞ্জিনের শব্দের কারণে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য শোনা যাচ্ছিল না।
চলতি সপ্তায় ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে হঠাৎ সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, তাকে নিয়ে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে নেতিবাচক প্রতিবেদন’ প্রকাশে তিনি বিরক্ত। সিক্রেট সার্ভিস শনিবার সাংবাদিকদের প্রেস ব্যাজ কেড়ে নেয়।
ফক্স নিউজের ওয়াশিংটন ব্যুরোপ্রধান এবং বর্তমানে টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের পুলের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা ব্রায়ান বোটন সোমবার পুলের সদস্যদের ই-মেইলে লেখেন, ‘আজ থেকে টেলিভিশন পুল প্রেসিডেন্টের পুল কভারেজ হিসেবে নির্ধারিত কোনো অনুষ্ঠান কভার করবে না।’ এই দায়িত্ব প্রতি তিন মাসে পরিবর্তন হয়। বোটন বললেন, ‘সিএনএনকে তার নির্ধারিত পুলের দায়িত্ব পালন করতে বাধা দেওয়ার বিষয়ে হোয়াইট হাউসের অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
নিষিদ্ধ সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের ফটোগ্রাফি পুলের অংশ হিসেবে তোলা ছবি তারা প্রকাশ বা বিতরণ করবে না। এর মধ্যে মেরিন ওয়ানে ট্রাম্পের রওনা হওয়া এবং নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে তার কর্মসূচির ছবিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় মধ্যরাত পর্যন্ত এসব ছবি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট এক বিবৃতিতে এই পদক্ষেপকে ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টার’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সিএনএনসহ পাঁচটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ‘সরকার সম্পর্কে সঠিক ও স্বাধীন তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। কোনো প্রশাসন তার প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকার কারণে কোনো সংবাদমাধ্যমকে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।’
টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো সম্প্রচার কভারেজ বন্ধ রাখলেও সংবাদপত্র, রেডিও ও বার্তা সংস্থাগুলোর প্রেস পুল দিনের বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্পের গতিবিধি নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।
টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর ওয়াশিংটন পোস্টও জানায়, নিষিদ্ধ সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি সমর্থন জানাতে প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন কর্মসূচির ছবি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় মধ্যরাতের পর পর্যন্ত প্রকাশ করবে না।
ট্রাম্প শুক্রবার হঠাৎ ঘোষণা দেন, সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। তার দাবি, সংবাদমাধ্যমগুলো ‘নিয়মিতভাবে কল্পকাহিনি ও মিথ্যা’ প্রতিবেদন বা সংবাদ প্রকাশ করে। শনিবার এসব সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মীদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
অন্য সংবাদমাধ্যম ও প্রথম সংশোধনী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করেছে। তারা একে মুক্ত সংবাদমাধ্যমের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাও সোমবার ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তারা ফেডারেল বিচারকের কাছে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করা এবং সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশের অনুমতিপত্র ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প তার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ‘মুক্ত সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা’ চালানো হচ্ছে না। বরং এটি ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ হুমকি মোকাবিলার পদক্ষেপ। সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের সামনে বিজয় তোরণ ও হোয়াইট হাউসে বলরুম নির্মাণের যৌক্তিকতা দেখাতেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এই দাবি ব্যবহার করেছেন।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান





