প্রার্থী বাছাই শুরু বিএনপির
- স্থানীয় সরকার নির্বাচন

ফাইল ছবি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের এখনো তফসিল ঘোষণা হয়নি। তবু দেশের গ্রামবাংলার রাজনৈতিক উঠানে যেন নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ইউনিয়নের চায়ের দোকান, বাজারের মোড় কিংবা দলীয় কার্যালয়— সবখানেই ঘুরছে একটি প্রশ্ন, ‘চেয়ারম্যান পদে শেষ পর্যন্ত কে?’ ক্ষমতায় থাকা বিএনপির জন্য এবার চ্যালেঞ্জ শুধু নির্বাচন নয়, অসংখ্য আগ্রহী মুখের ভিড় থেকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মানুষটিকে খুঁজে বের করা। সেই লক্ষ্যে অনেকটা নীরবেই তৃণমূল জুড়ে শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এক বাছাই পর্ব।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছেন দলটির তৃণমূলের নেতারা। উপজেলা ও থানা পর্যায়ের নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের যাচাই-বাছাইয়ের। জনপ্রিয়তা, জনগ্রহণযোগ্যতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা— এই তিনটি মানদণ্ড সামনে রেখে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে দলীয় সূত্র বলছে, এই তিনটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জনপ্রিয়তাকেই। এমনকি দলের বাইরেও যদি কোনো ব্যক্তি এলাকায় ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় হন, তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। আর সেই নির্বাচন শুরু হতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে। তাই সময় নষ্ট না করে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি।
এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কয়েক সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সাংগঠনিক জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন তারেক রহমান। গত ১৮ জুলাই রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পরে ২৫ জুলাই একই বিভাগের নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট এবং রংপুর জেলা ও মহানগরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। এসব বৈঠকে সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলা এবং পৌর বিএনপি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা অংশ নিয়েছেন।
বৈঠকে তারেক রহমান স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ধরনের কোন্দল বা বিভক্তি যেন তৈরি না হয়। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে একজন একক ও সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করে সবাইকে তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। পরে জেলা নেতারা উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে সেই নির্দেশনা তৃণমূলে পৌঁছে দেন। যেসব জেলার সঙ্গে এখনো বৈঠক হয়নি, সেখানেও সাংগঠনিকভাবে একই নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে, যাতে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ দেরি না হয়।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান। সপ্তাহের শুরুতে প্রতি শনিবার এসব বৈঠক হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ শনিবারও রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আরও সতর্ক বিএনপি। ওই নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনে দলের নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় অনেক এলাকায় বিভক্তি ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। তা মাথায় রেখে এবার আগেভাগে একক প্রার্থী নির্ধারণের কৌশল নেওয়া হয়েছে। তারেক রহমান নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও প্রার্থী নির্ধারণে দলের সিদ্ধান্ত হবে সমষ্টিগত এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে দায়িত্বও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে উপজেলা পর্যায়ের নেতারা সমঝোতার মাধ্যমে একজন প্রার্থী চূড়ান্ত করার চেষ্টা করবেন। সেখানে জটিলতা তৈরি হলে বিষয়টি দেখবেন জেলা নেতারা। প্রয়োজন হলে বিভাগীয় নেতারা হস্তক্ষেপ করবেন। সবশেষেও সমাধান না হলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে একজন প্রার্থীকে সমর্থন দেবে।
তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে গাইবান্ধা জেলা বিএনপি সভাপতি অধ্যাপক ডা. মইনুল হাসান সাদিক বললেন, দলের চেয়ারম্যান তৃণমূল থেকেই একক প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে এবং যার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি বলে প্রতীয়মান হবে, তাকেই মনোনীত করা হবে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন তুহিন জানিয়েছেন, চেয়ারম্যানের নির্দেশনা পাওয়ার পর জেলার ২২টি ইউনিয়নের নেতাদের নিয়ে বর্ধিত সভা করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ চলছে। যাচাই-বাছাই শেষে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কেন্দ্রে পাঠানো হবে। তার ভাষায়, ‘গ্রহণযোগ্য, যোগ্য ও জনমুখী নেতৃত্ব গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন বলেছেন, বিএনপি এখন বড় ও ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় প্রতিটি ইউনিয়নেই একাধিক আগ্রহী প্রার্থী থাকা স্বাভাবিক। তাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার কাজ চলছে। তিনি দাবি করেন, বরিশাল বিভাগে দল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং গত সংসদ নির্বাচনেও সেই ঐক্যের প্রতিফলন দেখা গেছে।
রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত জানিয়েছেন, তার বিভাগে কয়েক দিন ধরেই সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। কোথাও কোথাও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নীরব সমর্থন দিয়ে মাঠে কাজ করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে। পরে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চূড়ান্ত নির্দেশনা তৃণমূলে পৌঁছে দেওয়া হবে।
প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে, বিএনপির তৃণমূলে নির্বাচন যেন এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। প্রার্থীদের পোস্টার নয়, চলছে জনপ্রিয়তার হিসাব; প্রকাশ্য প্রচারণা নয়, চলছে গ্রহণযোগ্যতার যাচাই। দলের লক্ষ্য একটাই— ক্ষমতার সুবিধা নয়, দলের জন্য এমন একজন মুখ খুঁজে বের করা, যিনি ভোটের মাঠেও এগিয়ে থাকবেন এবং দলের ভেতরেও ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠবেন।




