হাতিয়া
গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘদিন শূন্যতা, জনসেবায় চরম ভোগান্তি

একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। ছবি: সংগৃহীত
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মৎস্য ও পৌর প্রশাসনসহ বিভিন্ন সেবাখাতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাতিয়ায় প্রায়ই নতুন ও অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়, আবার অল্প সময়ের মধ্যেই বদলি বা প্রশিক্ষণে পাঠানো হয় তাদের। এতে ভেঙে পড়ে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন সাধারণ মানুষ। সচেতন মহলের প্রশ্ন, লাখো মানুষের এই জনপদ কি কোনো পরীক্ষাগার হতে পারে?
প্রায় ২ হাজার ১০০ বর্গমাইল আয়তনের হাতিয়ায় সাড়ে ৬ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলে প্রশাসনের সামান্য শূন্যতাও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলে। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই কখনো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কখনো সহকারী কমিশনার (ভূমি), কখনো চিকিৎসক, শিক্ষা কর্মকর্তা কিংবা মৎস্য কর্মকর্তার পদ থাকছে শূন্য।
এর প্রভাব স্পষ্টভাবে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। বুড়িরচর ইউনিয়নের বাসিন্দা কালাম জানান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) না থাকায় তার জমিসংক্রান্ত মামলার শুনানি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। পৌর এলাকার বাসিন্দা আকতার ও মহিউদ্দিন বলেন, পৌর প্রশাসক না থাকায় নাগরিক সনদ, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা পেতে তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে মাসের পর মাস।
স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পদও দীর্ঘদিন শূন্য। গত বছরের ২৯ অক্টোবর বদলির পর এখনো নতুন কর্মকর্তা যোগ না দেওয়ায় পাশের উপজেলা থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একইভাবে ২০২৩ সাল থেকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় স্থবিরতা তৈরি হয়েছে শিক্ষা প্রশাসনেও।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদেও চলছে একই সংকট। নতুন কর্মকর্তা যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরই চলে যান প্রশিক্ষণে। প্রশিক্ষণ শেষে দেড় মাস দায়িত্ব পালন করে গত ৯ জুলাই আবার বদলি হয়ে যান তিনি। ফলে ভূমি অফিসের কার্যক্রম নতুন করে ব্যাহত হয়। এ অবস্থায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেবাপ্রার্থীদের ওপর। কর্মকর্তাদের ঘনঘন বদলির কারণে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নিবন্ধন আইডি ব্যবস্থাপনাতেও বারবার জটিলতা তৈরি হয়। এতে নাগরিক সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
উপজেলার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করেন, হাতিয়ার মতো বৃহৎ ও জনবহুল উপজেলাকে ‘কাজ শেখার জায়গা’ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এখানে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের তুলনামূলক দীর্ঘমেয়াদি পদায়ন প্রয়োজন। একই মত প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিকরাও। তাদের মতে, এই অঞ্চলে পরীক্ষামূলক পদায়নের সুযোগ নেই। বরং জরুরি ভিত্তিতে অভিজ্ঞ প্রশাসক, কর্মকর্তা ও চিকিৎসক নিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
‘সচেতন নাগরিক সমাজ-হাতিয়া’র সদস্য আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই উপজেলায় রিপ্লেসমেন্ট ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি রাখা উচিত নয়।’
সমাজকর্মী দুলাল উদ্দিন মন্তব্য করেন, ‘এত বড় একটি জনপদকে নতুন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ।’
সাবেক অধ্যক্ষ মো. এনামুল হকের দাবি, ‘হাতিয়া এখন আর প্রান্তিক কোনো জনপদ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল উপজেলা। তাই এখানে অভিজ্ঞ প্রশাসক ও চিকিৎসক নিয়োগ অপরিহার্য।’
প্রফেসর তোফায়েল হোসেন বলেন, ‘হাতিয়া ক্যাডার সার্ভিসের টেস্ট গিনিপিগ নয়। এখানে শেখার নয়, কাজ করার মানুষ দরকার।’
এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন আগামীর সময়কে মুঠোফোনে বলেন, হাতিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং সময়মতো রিপ্লেসমেন্ট নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি জানান, অল্প সময়ের মধ্যেই সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তবেও যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, হাতিয়া কোনো পরীক্ষাগার নয়। এখানে প্রতিটি প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক শূন্যতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের সেবা, অধিকার ও জীবনযাত্রার প্রশ্ন।




