লাকী আপার ফ্রি পাঠশালা

পাঠশালায় শিশুদের পড়াচ্ছেন মোবাশ্বেরা খাতুন লাকী
ছোটবেলা থেকেই লাকীর স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়ার। দরিদ্রতার পাশাপাশি অসুস্থ বাবা-মায়ের দেখাশোনা করতে গিয়ে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। বর্তমানে অনেক শিশুর স্বপ্নপূরণে কাজ করছেন তিনি। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত রহিমাপুর মোল্লাপাড়া গ্রামের মোবাশ্বেরা খাতুন লাকীকে এলাকাবাসী চেনেন লাকী আপা নামে। দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির অধীনে শিক্ষিকার চাকরি নেন।
একসময় তারাগঞ্জে ব্র্যাকের সেই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গেলেও লাকীর শিক্ষকতা করার ইচ্ছা ছিল অটুট। তাই ২০১২ সালে নিজ বাড়ির একটি ঘরে ৮-১০ জন শিশু নিয়ে পড়ানো শুরু করেন। এখানে পড়াতে লাকী কোনো বেতন নেননি। বাঁশের তৈরি ঘরে মাটির মেঝেতে চট বিছিয়ে বসে শিশুরা পড়াশোনা করে এখানে।
লাকী শুধু বইয়ের পড়াই শেখান না। শেখান সততা, মানবিকতা, দেশপ্রেম ও শৃঙ্খলাও। শিশুদের প্রতিদিন পাঠদানের পাশাপাশি জীবনবোধেরও গল্প শোনান। তাই শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি শুধু শিক্ষকই নন, পরিবারের একজন অভিভাবকের মতো।
বর্তমানে এই পাঠশালায় নিয়মিত সকাল-বিকাল দুবেলা ২৫-৩০ শিশু পড়াশোনা করে। তার পাঠশালায় পড়া কোনো কোনো শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে শিক্ষক, প্রকৌশলী হয়েছেন। আবার অনেকে সরকারি-বেসরকারি চাকরি করছেন। লাকী বলেছেন, ‘আমি ২০১২ সাল থেকে এই পাঠশালায় পড়াচ্ছি। যেসব ছাত্রছাত্রীকে পড়াই, তারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে।’ তার আশা, ‘আমি যাদের পড়াই, তাদের অনেকেই একদিন অনেক বড় হবে। দেশপ্রেমিক হয়ে দেশের জন্য কাজ করবে।’ লাকী স্বামী ও এক ছেলে নিয়ে তার বাবার বাড়িতে থাকেন। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কিছু জমি চাষাবাদ করেন। বাকি জমি বর্গা দেন। এ থেকে যে আয় হয়, তা দিয়েই চলে তার সংসার।
রহিমাপুর মোল্লাপাড়ার দিনমজুর আনা হোসেন বললেন, ‘আমার ছেলে কখনো স্কুলে যেত না। লাকী আপার কাছে পড়ে এখন নাম লিখতে পারে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন সে চাকরি করবে।’
উত্তর রহিমাপুর নয়াহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. ফরহাদ হোসেনের ভাষ্য, ‘লাকী আমারই ছাত্রী ছিল। ছোট থেকেই অত্যন্ত মেধাবী। তার পাঠদানের কৌশল ভিন্ন, খুব সহজেই যেকোনো বিষয় শেখাতে পারে। এটি তার বিশেষ গুণ।’
কুর্শা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. যাদু মিয়া বলছিলেন, ‘লাকী আপা এলাকার ছোট ছেলেমেয়েদের দীর্ঘদিন থেকে বিনামূল্যে পড়াচ্ছেন। এমন অজপাড়াগাঁয় তার শিক্ষার আলো ছড়ানোর এই কার্যক্রম ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তার এ কাজকে আমি সাধুবাদ জানাই।’
লাকীর স্বপ্ন, কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে ভবিষ্যতে বড় পরিসরে একটি স্কুল খুলবেন। তিনি মনে করেন, একজন মানুষ চাইলে পুরো সমাজই বদলে দিতে পারে। এজন্য প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা।’




