রাশিয়ার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের বড় আঘাত, নিষেধাজ্ঞা বিল এখন ট্রাম্পের হাতে
- ২৬২–১৫৯ ভোটে হাউসে পাস
- রুশ জ্বালানি কিনলেই ১০০% শুল্ক

২৬২–১৫৯ ভোটে পাস হওয়া বিলটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টেবিলে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস। দীর্ঘ দেড় বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর রাশিয়া ও ইরানবিষয়ক ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক বিল পাস করেছে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ। ২৬২–১৫৯ ভোটে পাস হওয়া বিলটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টেবিলে। স্বাক্ষর করলেই এটি আইনে পরিণত হবে।
বিলটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’। প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে নামকরণ করা এই আইনের লক্ষ্য রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানো এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর জন্য মস্কোর অর্থের উৎস সংকুচিত করা।
হাউসে বিলটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২০৩ রিপাবলিকান, ৫৮ ডেমোক্র্যাট ও একজন স্বতন্ত্র সদস্য। বিপক্ষে ছিলেন সাত রিপাবলিকান ও ১৫২ ডেমোক্র্যাট। এর আগে আগস্টে সিনেট ৮৬–১১ ভোটে বিলটি অনুমোদন করেছিল।
ট্রাম্পের হাতে ১০০ শতাংশ শুল্কের ক্ষমতা
নতুন আইনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো রুশ জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর কঠোর শুল্ক আরোপের ক্ষমতা।
বিলটি প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেবে। অর্থাৎ রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখা দেশগুলো মার্কিন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অতিরিক্ত বাণিজ্যিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বের অন্যতম বড় রুশ জ্বালানি ক্রেতা চীন ও ভারত এই ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। তবে শুল্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এ ক্ষমতা প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এখানেই পুরো বিলের বাস্তব প্রভাব অনেকাংশে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
নিশানা রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’
বিলের আরেকটি বড় লক্ষ্য রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রুশ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ট্যাংকার ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থ দেশটির যুদ্ধ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই তেল পরিবহনের এই বিকল্প নেটওয়ার্কে চাপ তৈরি করতে পারলে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিলের সমর্থকেরা।
রাশিয়ার জ্বালানি খাত, প্রতিরক্ষা শিল্প, সরকারি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং যুদ্ধের অর্থায়ন ও সরবরাহে সহায়তাকারী বিদেশি নেটওয়ার্কও নতুন ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
ওয়াশিংটনে দুই দলের টানাপোড়েন
বিলটি বড় ব্যবধানে পাস হলেও কংগ্রেসে এর বিরোধিতা ছিল।
ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশের প্রধান আপত্তি ছিল ট্রাম্পকে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে। তাঁদের আশঙ্কা, রাশিয়াকে চাপ দিতে তৈরি করা ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা হতে পারে।
অন্যদিকে বিলের সমর্থকেরা বলছেন, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে শুধু পুরোনো নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। রুশ জ্বালানি কিনে মস্কোর রাজস্ব ধরে রাখতে সহায়তা করা দেশগুলোকেও চাপের মধ্যে আনতে হবে।
ফলে কংগ্রেসের ভোটে দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও বিলটি শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
ক্রেমলিনের সতর্কবার্তা
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপে মস্কোর প্রতিক্রিয়াও এসেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ, একদিকে ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে যাচ্ছে, অন্যদিকে মস্কো বলছে এই পদক্ষেপ কূটনৈতিক সমাধানের পথকে আরও জটিল করবে।
ইউক্রেন অবশ্য বিলটির পাসকে স্বাগত জানিয়েছে। কিয়েভের দৃষ্টিতে রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।
এখন সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের
দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কংগ্রেসে আটকে থাকা বিলটি শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডেস্কে পৌঁছেছে। এখন মূল প্রশ্ন—ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করবেন কি না এবং স্বাক্ষরের পর তিনি ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কতটা ব্যবহার করবেন।
কারণ আইন পাস হওয়া এক বিষয়, আর সেই আইনের সবচেয়ে কঠোর ধারাগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করা আরেক বিষয়।
রাশিয়ার ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর পাশাপাশি রুশ তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতাদের ওপর শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এই বিলের প্রভাব ওয়াশিংটন-মস্কো সম্পর্কের বাইরেও যেতে পারে। বিশ্ব জ্বালানি বাজার, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এবং চীন-ভারতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখন তাই পুরো নজর হোয়াইট হাউসের দিকে। কংগ্রেসের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নয়—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে।
সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), পিবিএস নিউজআওয়ার, আল জাজিরা, রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টি, মার্কিন সিনেট পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটি



