রেকর্ড দামে ডিজেল, ইরান যুদ্ধের ধাক্কা মার্কিন অর্থনীতিতে

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা জ্বালানি পাম্পে নয়—দামের এই আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো বাজারে।
যুদ্ধের আগুন এবার আমেরিকার জ্বালানি পাম্পেও। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম উঠে গেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। শুক্রবার জাতীয় গড় দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি গ্যালন ৫ দশমিক ৮৫ ডলার—রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালের জুনে তৈরি আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে।
শুধু ডিজেল নয়, পেট্রোলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। লেবার ডে ছুটির সপ্তাহান্তে নিয়মিত গ্যাসোলিনের জাতীয় গড় দাম প্রায় ৪ দশমিক ১৪ ডলার প্রতি গ্যালনে পৌঁছেছে। ফলে ছুটিতে গাড়ি নিয়ে বের হওয়া থেকে শুরু করে প্রতিদিনের কর্মযাত্রা—সবকিছুর খরচেই বাড়তি চাপ পড়ছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় আশঙ্কা জ্বালানি পাম্পে নয়—দামের এই আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো বাজারে।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য, পোশাক, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিশাল অংশ ট্রাক, রেল ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যায়। এসব পরিবহনে ডিজেলের বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, আর সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত চাপতে পারে ভোক্তার কাঁধে।
এর প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত অনুভূত হতে পারে গ্রোসারি দোকান, ডেলিভারি সার্ভিস, ট্রাকিং, কৃষি ও নির্মাণ খাতে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন। ইতোমধ্যে কিছু ব্যবসা অনলাইন অর্ডার ও প্যাকেজ সরবরাহে বাড়তি ফি নেওয়া শুরু করেছে।
হরমুজই এখন বড় আতঙ্ক
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে।
ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দামও শুক্রবার প্রায় ৯৫ ডলার ছুঁয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধের অভিঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আটকে নেই—তার ঢেউ সরাসরি আঘাত করছে মার্কিন অর্থনীতিতে।
কৃষক-ট্রাকচালক থেকে সাধারণ পরিবার
ডিজেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে কৃষক ও ট্রাকচালকদের ওপর বড় চাপ তৈরি হবে। কৃষিযন্ত্র চালানো, ফসল পরিবহন, গুদাম থেকে বাজারে পণ্য পাঠানো—প্রতিটি ধাপেই বাড়তে পারে ব্যয়। এর প্রভাব খাদ্যপণ্যের দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ির জ্বালানি, গ্রোসারি, ডেলিভারি ও দৈনন্দিন যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন—এই মূল্যস্ফীতির চাপ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কতটা বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে?
ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও তত বাড়বে। ফলে আজকের ৫.৮৫ ডলারের ডিজেল শুধু একটি রেকর্ড মূল্য নয়—এটি মার্কিন অর্থনীতিতে যুদ্ধের গভীরতর প্রভাবের একটি সতর্ক সংকেত।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের গোলা, আর আমেরিকায় তার হিসাব—পাম্পে, বাজারে এবং পরিবারের বাজেটে।
সূত্র: রয়টার্স; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি); আল জাজিরা; ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস; মার্কেটওয়াচ; আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ)।





