ট্রাম্প-শির ‘উষ্ণ’ বৈঠকে বিরোধ কতটা মিটল?

হোয়াইট হাউসে আয়োজিত নৈশভোজে শি জিনপিং বক্তব্য দেওয়ার আগে পাশে দাঁড়িয়ে একটি ফোল্ডার হাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প— রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হোয়াইট হাউসে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন। এ সময় পরস্পরের প্রতি উষ্ণ মন্তব্য করেছেন তারা। তবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতির খুব বেশি ইঙ্গিত দেননি তারা।
শি জোর দিয়ে বলেছেন, দুই দেশকে নিশ্চিত করতে হবে যেন এআই ‘মানুষের নিয়ন্ত্রণে’ থাকে এবং তারা যেন ‘দায়িত্বশীল বড় দেশ হিসেবে’ কাজ করে। অন্যদিকে ট্রাম্প দুই দেশের জন্য ‘সম্প্রীতি, শান্তি ও সাফল্যে’ ভরা ভবিষ্যতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
তবে কূটনৈতিক সৌজন্যের আড়ালেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে তাইওয়ান ইস্যু। বেইজিং নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করা স্বশাসিত দ্বীপটির বিষয়ে ট্রাম্পকে দিনের শুরুতে ‘সঠিক অবস্থান’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন শি। এ সময় ট্রাম্পের স্থগিত করা একটি বড় অস্ত্র প্যাকেজও আলোচনায় ছিল।
নৈশভোজের অতিথিদের মধ্যে ছিলেন ধনকুবের ব্যবসায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের প্রধান নির্বাহীরা।
তবে তাদের আগমন ঘিরে বাইরে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশে বৃহস্পতিবার রাতে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার জন্য শিকে ধন্যবাদ জানান। দুই নেতার সম্পর্কও শক্তিশালী বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্প বললেন, ‘আমরা এর আগে কখনো এত ভালোভাবে একসঙ্গে চলতে পারিনি।’
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রশংসা করেন তিনি। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বক্তৃতার বিষয় থেকে সরে গিয়ে চলমান বলরুম নির্মাণ প্রকল্পের প্রশংসাও করেন।
অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছেন, ‘বিশেষ উপহার’ হিসেবে চীনা নেতা ও তার স্ত্রীই যেন প্রথমে ওই বলরুমে প্রবেশ করেন। তবে এর নির্মাণকাজ শেষ হতে এখনো প্রায় এক বছর বাকি।
তিনি বললেন, ‘যে কেউ সুন্দর, পরিষ্কার ও ঝকঝকে একটি নির্মাণস্থলে প্রবেশ করতে চাইলে, আপনাদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া আমাদের জন্য সম্মানের।’
ট্রাম্প শিকে আমেরিকার জাতীয় প্রতীক টাকমাথা ঈগলের একটি ভাস্কর্যও উপহার দেন। তিনি বলেন, এটি ‘আমেরিকার স্বাধীন ও উড্ডীয়মান চেতনার’ প্রতীক।
তিনি বললেন, ‘আমরা আশা করি, বেইজিংয়ে এটি একটি সুন্দর ও চমৎকার জায়গা পাবে। এটি আপনাদের জন্য সম্মানের।’
ট্রাম্প আরও জানান, তিনি ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ভাস্কর্যটির নকশা তৈরিতে অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে শি তাকে ও তার স্ত্রীকে ‘অত্যন্ত যত্ন ও বিবেচনার সঙ্গে’ আতিথেয়তা দেওয়ার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান। এতে তারা ‘সত্যিই নিজেদের বাড়িতে আছেন বলে মনে করেছেন’ বলেও জানান তিনি।
শি বলেন, দুই নেতা ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিহাস সৃষ্টি করছেন।’
তিনি বললেন, ‘আমরা কৌশলগত স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে একটি গঠনমূলক চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছি।’ দুই নেতা ‘আন্তরিক ও গভীর মতবিনিময়’ করেছেন, যা দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্পের মতো শির বক্তব্যেও প্রশংসার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং অভিন্ন ইতিহাসের ওপর জোর দেন।
শি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় দুই দেশের সম্পর্ক ‘রক্ত ও আগুনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল’। পরে নিক্সন প্রশাসনের সময় ‘পিং-পং কূটনীতি’র মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ক আরও এগিয়ে যায়।
বক্তব্যের শেষদিকে শি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের লক্ষ্যগুলো ‘একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে’। দুই দেশকে ‘বড় দেশগুলোর পারস্পরিক সহাবস্থানের নতুন পদ্ধতি’ খুঁজে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অন্য একটি টেবিলে বসেছিলেন। তার মুখে ছিল গম্ভীর ভাব। তার পাশে বসেছিলেন তার স্ত্রী। কাছেই ছিলেন জ্যারেড কুশনার ও হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ মনিকা ক্রাউলি।
হোয়াইট হাউস বিপুলসংখ্যক মার্কিন কর্মকর্তা ছাড়াও রক্ষণশীল সম্প্রচারমাধ্যমের ব্যক্তিত্ব, প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রধান নির্বাহী এবং অন্যান্য করপোরেট নির্বাহীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
অতিথিদের মধ্যে ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্যদের পাশাপাশি তার সন্তান ইভানকা, এরিক ও টিফানিও ছিলেন।
প্রযুক্তি খাতের উপস্থিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন অ্যাপলের টিম কুক, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, গুগলের সুন্দর পিচাই, অ্যামাজনের জেফ বেজোস এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং।
কুক ও হুয়াং দুজনই ট্রাম্প ও শির সঙ্গে একই টেবিলে বসেছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন মাস্কও, যিনি আগে ট্রাম্প প্রশাসনে কাজ করে সরকারের আকার কমানোর উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
এ ছাড়া জেনারেল মোটরস, ভিসা, প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স, এক্সনমোবিলসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ধনকুবের মার্ক জাকারবার্গও অনুষ্ঠানে ছিলেন। ছিলেন টিকটকের মালিকানার অংশীদার মার্কিন ধনকুবের জেফ ইয়াসও।
অনুষ্ঠানের আগে ট্রাম্প বললেন, ‘সবাই সেখানে থাকতে চেয়েছিল। আমি বলব, পুরো প্রযুক্তি জগৎ, পুরো ব্যাংকিংজগৎ এবং আরও অনেকেই সেখানে রয়েছে।’
তবে উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপস্থিত ছিল বিশ্বের অন্যতম বড় ও মূল্যবান এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কি না, নাকি তারা নিজেরাই অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা জানতে বিবিসি অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা করা ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার কার্যালয় জানিয়েছে, নৈশভোজের মেন্যুতে ‘সূক্ষ্ম চীনা প্রভাবসহ আমেরিকান উপাদান’ তুলে ধরা হবে।
প্রথম পদে অতিথিদের পরিবেশন করা হয় হলুদ স্কোয়াশ, বন্য মাশরুম ও খাস্তা প্যানচেটা। তারা লাল টেবিলক্লথে খাবার খান। চীনে লাল রঙ সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
প্রধান পদে ছিল তিলের আবরণে রান্না করা সি বাস, ব্রেইজড বক চয় ও রোস্ট করা বেগুন।
ডেজার্টে ছিল ভ্যানিলা ক্রেম্যু ও টক চেরির কনফি। এর সঙ্গে ছিল ‘হোয়াইট হাউস থেকে সংগ্রহ করা মধু দিয়ে তৈরি’ আইসক্রিম।
ফার্স্ট লেডি যে ওয়াইন বেছে নিয়েছিলেন, তার মধ্যে ছিল শ্রামসবার্গ ব্ল্যাংক দ্য নোয়ার। ১৯৭২ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তৎকালীন চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাইয়ের ‘টোস্ট টু পিস’ অনুষ্ঠানে একই আঙুরবাগানের একটি বোতল ব্যবহার করা হয়েছিল। সেটির প্রতি এটি ছিল একটি ইঙ্গিত।
ট্রাম্প ও শি তাদের স্ত্রীদের নিয়ে হোয়াইট হাউসের রেড রুমে চা পান করে দিন শুরু করবেন।
এরপর তারা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভসে যাবেন এবং ভবন ও সেখানে থাকা প্রদর্শনী ঘুরে দেখবেন।আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাশনাল আর্কাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নামে পরিচিত এই ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন সংবিধান, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং বিল অব রাইটস।
দিনের শেষদিকে শি ও তার স্ত্রী ওয়াশিংটন ত্যাগ করবেন।
সূত্র : বিবিসি






