শি জিনপিংকে রাজকীয় অভ্যর্থনা, ট্রাম্প আসলে কী চান

যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে রাষ্ট্রীয় সফরে আসা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু হয়েছে নজিরবিহীন জাঁকজমকের মধ্য দিয়ে। এক দশকের বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেছেন শি। তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে নিজেই উপস্থিত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সাধারণত বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানান। কিন্তু শির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের আয়োজন ছিল আলাদা। সামরিক ঘাঁটিতে লালগালিচা, সামরিক আনুষ্ঠানিকতা, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাতের আয়োজন করা হয়েছে।
এই জাঁকজমকের পেছনে শুধু সৌজন্য নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের কঠিন বাস্তবতা। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান ও ইরান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে গভীর মতবিরোধ রয়েছে। তারপরও দুপক্ষ সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার বার্তা দিতে চাইছে।
ট্রাম্প শির কাছ থেকে কী চান
ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো বাণিজ্যে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে শুল্ক নিয়ে বিরোধ চলছে। পাল্টাপাল্টি শুল্কের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছিল। পরে দুই দেশ একটি বাণিজ্যিক সমঝোতায় পৌঁছায়। সেই সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানো এখন আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি বাড়ানো অথবা আরও বড় একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বর্তমান সমঝোতার মেয়াদ ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা।
ট্রাম্পের জন্য বিষয়টি ঘরোয়া রাজনীতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক চাপ ও জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাই চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারলে তা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে।
বদলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন শক্তির ভারসাম্য
শি এবার ওয়াশিংটনে এসেছেন তুলনামূলক শক্ত অবস্থান থেকে।
গত কয়েক বছরে চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
চীন এখন শুধু সস্তা পণ্য উৎপাদনকারী দেশ নয়। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তি ও শিল্প উৎপাদনের অনেক ক্ষেত্রে দেশটির বড় সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে বিরল খনিজের ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। এসব খনিজ স্মার্টফোন থেকে শুরু করে সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে প্রয়োজন হয়।
ফলে বাণিজ্য বিরোধে চীনের হাতে এখন পাল্টা চাপ দেওয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগের মতো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না বেইজিংকে।
তাইওয়ান নিয়ে কঠিন আলোচনা
দুই নেতার বৈঠকে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হবে তাইওয়ান।
বেইজিং তাইওয়ানকে চীনের অংশ বলে দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না রাখলেও দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
চীন চাইছে, তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধ হোক। শির সফরের আগে এ বিষয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও পণ্যের ক্ষেত্রে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে চাইছে না।
ফলে বাণিজ্য নিয়ে কিছু সমঝোতা হলেও তাইওয়ান প্রশ্নে বড় ধরনের অগ্রগতি কঠিন হতে পারে।
ইরান নিয়েও আলোচনা হতে পারে
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধও বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নিয়ে চীন দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে চীনের অর্থনীতির জন্য স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প চাইতে পারেন, ইরান নিয়ে চলমান অচলাবস্থা কাটাতে চীন কোনো ভূমিকা রাখুক। তবে এ বিষয়ে বেইজিং কতটা সহযোগিতা করবে, তা স্পষ্ট নয়।
অর্থাৎ, ইরান ইস্যুতে দুই দেশের স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়েও প্রতিযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এখন শুধু বাণিজ্য বা সামরিক শক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও দুই দেশের তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।
দুই দেশই এআই প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে চাইছে। একই সঙ্গে এই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও সামরিক ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ফলে বৈঠকে এআই নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে। তবে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
দুই দেশ অন্তত আলোচনার একটি কাঠামো তৈরিতে আগ্রহী হতে পারে। এতে সরাসরি সমঝোতা না হলেও যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
শি কী চান
শির লক্ষ্যও খুব স্পষ্ট। বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে বড় ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধ চায় না। চীন চাইছে বর্তমান বাণিজ্যিক সমঝোতা আরও কিছু সময় চালু থাকুক।
এতে চীনা অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে চীন নিজের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারবে।
তাইওয়ান প্রশ্নেও শি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও স্পষ্ট অবস্থান চাইতে পারেন। বিশেষ করে তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি নিয়ে চাপ দিতে পারেন।
বন্দী মার্কিন নাগরিকদের বিষয়ও উঠতে পারে
ট্রাম্প চীনে আটক কিছু মার্কিন নাগরিক ও অন্য ব্যক্তির মুক্তির বিষয়ও তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটি দুই দেশের সম্পর্কের মানবিক ও কূটনৈতিক দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে বাণিজ্য ও তাইওয়ানের মতো বড় ইস্যুগুলোর তুলনায় এটি বৈঠকের সীমিত একটি অংশ হতে পারে।
জাঁকজমকের আড়ালে কঠিন বাস্তবতা
শিকে স্বাগত জানানোর আয়োজন যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক, দুই দেশের সম্পর্কের মূল সমস্যা রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্থানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। চীনও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে আগের মতো সহজে নতি স্বীকার করতে চাইছে না।
তাই এবারের বৈঠকে বড় কোনো ঐতিহাসিক সমঝোতার চেয়ে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বৈঠকটির মূল প্রত্যাশা হিসেবে বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং সম্পর্কের স্থিতিশীলতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে শির এই সফর একই সঙ্গে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার ছবি তুলে ধরছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতির সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তারা একে অন্যকে এড়িয়ে চলতে পারছে না। আবার বড় কোনো বিষয়ে পুরোপুরি একমতও হতে পারছে না।
সূত্র : এনডিটিভি








