হুতির হামলায় সৌদির পাশে দাঁড়াতে চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর

ডোনাল্ড ট্রাম্প— রয়টার্স
সৌদি আরবে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় প্রতিবেশী ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র রিয়াদকে সহায়তা বাড়াতে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ছে। সপ্তাহান্তে রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে হুতিদের ভয়াবহ হামলায় এক মার্কিন নাগরিকসহ অন্তত ১৬ জন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হয়েছেন। কয়েক দশকের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ, হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং আকাশে উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে রিয়াদকে সহায়তা করছে। তবে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো থেকে এখনো বিরত রয়েছে ওয়াশিংটন। সাম্প্রতিক সহিংসতা হোয়াইট হাউসকে মার্কিন বাহিনীকে কতটা গভীরভাবে এই সংঘাতে জড়ানো হবে, তা পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করছে। সপ্তাহান্তে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত হামলায় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন।
মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতার এই নতুন বিস্তার ট্রাম্পের জন্য এসেছে অত্যন্ত অসময়ে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি এমনিতেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। সৌদি জ্বালানি স্থাপনার পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজে হুতিদের হামলায় জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগী গবেষক নাতাশা হল সোমবার ব্লুমবার্গ টেলিভিশনকে বলেন, ‘এখানে ট্রাম্প কঠিন অবস্থানে রয়েছেন। কারণ, সৌদি আরবের সত্যিই সহায়তা প্রয়োজন। তারাও সম্ভবত জানে, সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট একপ্রকার আটকে আছেন। পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, সৌদিরা কৌশলগতভাবে নিজেদের পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে।’
এদিকে সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া ও চীন তেহরানকে সহায়তা করছে কি না, সে বিষয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দেন। তিনি লেখেন, ‘তারা যদি সহায়তা করেও থাকে, তা খুবই সীমিত পর্যায়ে।’ কয়েক দশক ধরে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে চীন ও রাশিয়া। তবে এই সংঘাতে তেহরানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে দেশ দুটি। অবশ্য অস্ত্র নিয়ে সহযোগিতার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অঞ্চলটিতে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কিংবা ইরানের যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশেষ করে, অতীতের মার্কিন প্রশাসনগুলোর ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ সমালোচনা করার পর এ বিষয়ে তাদের সতর্কতা বেড়েছে। হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে সহায়তা করলে গোষ্ঠীটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বর্তমানে হুতিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে শুধু সৌদি জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আক্রমণ না থাকায় ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পাশাপাশি সামরিক অভিযানে যোগ দিতে অন্য মিত্রদের দিকে তাকাতে বাধ্য হয়েছে সৌদি আরব।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে সীমিত সহায়তা পেয়ে হতাশ রিয়াদ এখন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অন্যান্য মিত্রের কাছ থেকেও মরিয়া হয়ে আরও সহায়তা চাইছে। সম্ভাব্য একটি পদক্ষেপ হতে পারে, হুতিদের দখলে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকা এবং প্রণালির আশপাশে আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আরও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা।
মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক কারেন ইয়ং বলেন, সৌদি আরব সম্ভবত ওয়াশিংটনের কাছে আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র চাইছে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা আরও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি।
ইয়ং বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইয়েমেনে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে কোনো সমর্থন নেই। সৌদি সামরিক পদক্ষেপের পক্ষেও সমর্থন খুবই কম। সৌদিরা কার্যত একাই রয়েছে।’
হামলাগুলোর কারণে হুতিদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী পাল্টা আঘাত হানার চাপ বাড়ছে রিয়াদের ওপর। তবে হুতিরা বছরের পর বছর ধরে সৌদি ও মার্কিন বোমা হামলা সহ্য করে টিকে রয়েছে। গোষ্ঠীটিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, সহিংসতা বন্ধ করতে আরও লড়াইয়ের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো প্রয়োজন।
ক্রমবর্ধমান হামলা সৌদি আরবের নতুন আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা অংশীদার তুরস্ক ও পাকিস্তানকেও কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। দেশ দুটি প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ দেখালেও তুরস্ক আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতা, ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রগতি এবং বেসামরিক মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি পুরো অঞ্চলে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র আবারও বোমা হামলা শুরু করলে ইরানের হামলার ঝুঁকিতে এমনিতেই রয়েছে এসব দেশ।
যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের নাগরিকদের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছে। একই সঙ্গে জানিয়েছে, সৌদি আরবের যেকোনো বিমানবন্দর ব্যবহার করতে মার্কিন সরকারি কর্মীদের বিশেষ অনুমোদন নিতে হবে।
সশস্ত্র সংঘাতের অবস্থান ও ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি)-এর বিশ্লেষক আমেনেহ মেহভার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা আরও বাড়াতে পারে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সৌদি আরবের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হবে।
মেহভার বলেন, ‘রিয়াদ যখন পাল্টা আঘাতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এবং ওয়াশিংটন সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করছে, তখন আরও বিমান হামলা চালানো হলে হামলা বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির আরেকটি চক্র তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের আগের বিমান অভিযানগুলো হুতিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সামরিক চাপের মুখেও হুতিরা বারবার হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ দেখিয়েছে।’
সূত্র: ব্লুমবার্গ





