লেনদেনের আড়ালে কারসাজি খুঁজতে হবে: বিএসইসি কমিশনার

ছবি: আগামীর সময়
শেয়ারবাজারে কারসাজি শনাক্ত করতে শুধু একটি লেনদেন নয়, বরং ধারাবাহিক লেনদেনের ধরন, উদ্দেশ্য ও সামগ্রিক প্রভাব বিশ্লেষণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার নাহিদ মাহতাব। তিনি বলেন, কোনো একটি লেনদেন আলাদাভাবে বৈধ মনে হলেও ধারাবাহিক লেনদেনের সামগ্রিক চিত্রে কারসাজির উদ্দেশ্য প্রকাশ পেতে পারে। তাই বাজার তদারকিতে লেনদেনের পাশাপাশি এর পেছনের উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
আজ সোমবার ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
নাহিদ মাহতাব বলেন, শেয়ারবাজারে সক্রিয়ভাবে লেনদেন করা নিজে কোনো অপরাধ নয়। অপরাধের প্রশ্ন আসে তখনই, যখন প্রাসঙ্গিক প্রমাণ ও আইনগত উপাদানের ভিত্তিতে বাজার কারসাজি বা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ক্ষেত্রে শুধু শেয়ারের দামের ওঠানামা দেখলে হবে না; লেনদেনের ধারাবাহিকতা, সামগ্রিক প্রভাব এবং এর পেছনের উদ্দেশ্যও মূল্যায়ন করতে হবে।
প্রযুক্তির কারণে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ সহজ হয়েছে। এখন ঘরে বসেই বাজারের তথ্য দেখা এবং অনলাইনে লেনদেন করা সম্ভব। তবে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতারকেরা দ্রুত ভুল তথ্য ছড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্যবস্তু করছে বলে জানান বিএসইসি কমিশনার।
তিনি বলেন, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপ এবং চ্যানেল ব্যবহার করে প্রতারণা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কিংবা পরিচিত ব্রোকারেজ হাউসের নাম, লোগো ও ছবি ব্যবহার করে নিজেদের বিশ্বস্ত হিসেবে উপস্থাপন করছে প্রতারক চক্র। কৃত্রিমভাবে তৈরি বার্তা, ছবি, কণ্ঠস্বর ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করেও বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া পরিচয় চুরি, ভুয়া বার্তা বা লিংকের মাধ্যমে তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং এককালীন পাসওয়ার্ড (ওটিপি) জালিয়াতির মতো ঝুঁকিও বাড়ছে। ব্যাংক বা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে ভুয়া ফোনকল, খুদে বার্তা ও লিংক পাঠিয়ে পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত শনাক্তকরণ নম্বর (পিন) এবং ওটিপি সংগ্রহ করা হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবের তথ্য হাতিয়ে নিয়েও বড় ধরনের প্রতারণার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
নাহিদ মাহতাব বলেন, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও, নকল কণ্ঠস্বর এবং অত্যাধুনিক প্রতারণামূলক প্ল্যাটফর্ম এসব ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে আর্থিক বিষয়বস্তু তৈরি করা ব্যক্তিদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন বিএসইসি কমিশনার। তার মতে, এসব ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের তথ্য ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারেন। কিন্তু তথ্যের প্রভাব যখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয়, তখন তা কারসাজির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, আর্থিক বিষয়বস্তু নির্মাতাদের অনেকে অনুমোদিত বিনিয়োগ পরামর্শের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছেন। তাই বিনিয়োগকারীদের কাছে কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য এবং কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা, তা আলাদা করে বোঝার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বাজার কারসাজি শনাক্ত করতে নজরদারি আরও তথ্যনির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দেন নাহিদ মাহতাব। তিনি বলেন, শুধু একটি লেনদেনের বৈধতা যাচাই করলেই চলবে না। লেনদেনের ধারাবাহিকতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সম্পর্ক, আচরণের ধরন এবং বাজারে এর প্রভাব বিশ্লেষণ করতে হবে।
তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত তথ্য বিশ্লেষণপ্রযুক্তি সন্দেহজনক লেনদেনের ধরন শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রযুক্তির কাজ হবে সন্দেহজনক বিষয় চিহ্নিত করে সতর্কসংকেত দেওয়া। চূড়ান্ত মূল্যায়ন ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের বিচারবিবেচনা এবং পর্যালোচনা প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, আইনগতভাবে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য এবং শেয়ারবাজারের নজরদারি ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে অনলাইনে ছড়ানো সন্দেহজনক প্রচারণার সঙ্গে বাজারের লেনদেনের যোগসূত্র বিশ্লেষণ করা সহজ হতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় আর্থিক জ্ঞান বাড়ানো, নজরদারি জোরদার এবং আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নাহিদ মাহতাব বলেন, শেয়ারবাজারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু মূলধন নয়, বিনিয়োগকারীদের আস্থাও। একজন বিনিয়োগকারী বাজারে অর্থ বিনিয়োগ করেন এর ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতার ওপর বিশ্বাস রেখে। সেই বিশ্বাস রক্ষা করা নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারী—সবার দায়িত্ব।
তিনি জানান, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বিএসইসি চেয়ারম্যান একটি সফটওয়্যার চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি কার্যকরভাবে চালু করা গেলে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি ও প্রতারণা কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিএসইসি কমিশনারের মতে, শেয়ারবাজারে ডিজিটাল প্রতারণা ও কারসাজি মোকাবিলায় প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং আইন প্রয়োগ—এই তিন ক্ষেত্রেই একযোগে কাজ করতে হবে।



