বিনা ভাড়ায় শিক্ষার্থীদের খেয়া পার

আব্দুল্লাহর নৌকায় করে নদী পার হয় শিক্ষার্থীরা
ভোরের আলো ফুটতেই নদীর ঘাটে ছুটে আসে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের অপেক্ষায় নৌকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন ৪৩ বছর বয়সী মাঝি আব্দুল্লাহ শেখ। নৌকা নদীর স্রোত কেটে এগিয়ে যায়। অন্য যাত্রীরা ৫ টাকা ভাড়া দিলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তিনি ভাড়া নেন না।
পাঁচ বছর ধরে এ কাজ করে আসছেন আব্দুল্লাহ। সংসারে অভাব থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য তার এই ছাড়ে কখনো ছেদ পড়েনি।
যশোরের অভয়নগর উপজেলার রাজঘাট কার্পেটিং জুট মিলস খেয়াঘাট থেকে ভৈরব নদের উত্তর পাশে বানীপুর খেয়াঘাট পর্যন্ত নদীপথটি আশপাশের মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ। অভয়নগরের ভৈরব নদের রাজঘাটের এই ঘাটটি ‘কার্পেটিং খেয়াঘাট’ নামে পরিচিত।
নদীর এপারে রাজঘাটে রয়েছে জাফরপুর উচ্চবিদ্যালয়, রাজঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাফরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, রাজঘাট কিন্ডারগার্টেন, জে জে আই সরকারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বিভিন্ন মাদ্রাসা ও নওয়াপাড়ায় বেশ কয়েকটি কলেজ। প্রতিদিন ৫০-৬০ শিক্ষার্থী এই নৌপথে যাতায়াত করে।
আব্দুল্লাহর এ কাজের শুরু তার শ্বশুরের পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে। তার শ্বশুর আব্দুল গফুর মোড়ল এই ঘাটে নৌকা চালাতেন। তার শ্বশুরও কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভাড়া নিতেন না।
২০ বছর বয়সে শ্বশুরের কাছ থেকে নৌকা চালানো শেখেন আব্দুল্লাহ। তখনই শ্বশুর তাকে বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া যাবে না। শ্বশুরের সেই কথা আজও অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন তিনি।
আব্দুল্লাহ নিজে সচ্ছল নন। সংসার চলে নৌকার আয় দিয়ে। দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করেন। এর মধ্য থেকেই নৌকার জ্বালানি, মেরামত ও সংসারের খরচ চালাতে হয়। নিজের বসতভিটা নেই। খেয়াঘাটের পাশে অন্যের জায়গায় ছোট্ট একটি ঘর করে পরিবার নিয়ে থাকেন। তার সংসারে স্ত্রী, এক ছেলে ও চার মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের বিয়ের খরচ মেটাতে গিয়ে নিজের বসতভিটা, গরু-ছাগল বিক্রি করতে হয়েছে। তারপরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়ার কথা ভাবেননি তিনি।
রাজঘাট জাফরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নওরিন আক্তার অর্পা জানিয়েছে, প্রতিদিন ৫০-৬০ শিক্ষার্থী রাজঘাট-নওয়াপাড়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। আব্দুল্লাহর নৌকায় উঠলে তাদের কখনো ভাড়া দিতে হয় না।
রাজঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাকারিয়া জানিয়েছেন, আব্দুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভাড়া নেন না।
নওয়াপাড়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও স্কুলশিক্ষক মাহবুব হোসেন হাজরা বললেন, নিজের আয় সীমিত হলেও আব্দুল্লাহ প্রতিদিনের আয়ের একটি অংশ শিক্ষার্থীদের জন্য ছেড়ে দিচ্ছেন।
আব্দুল্লাহ বললেন, ‘সবাই আমাকে সম্মান করে, ভালোবাসে। আর কী চাই? শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে চাই। যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভাড়া নেব না।’
উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তৈয়বুর রহমান বললেন, রাজঘাট কার্পেটিং খেয়াঘাটে প্রতিদিন শুধু মানুষই নদী পার হয় না; আব্দুল্লাহর বৈঠার সঙ্গে পার হয় বহু শিক্ষার্থীর স্বপ্নও। নিজে গরিব হলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভাড়া না নেওয়াটা তার মহানুভবতার পরিচয়।



