দেশের জ্বালানিতে এখন শুধুই যুক্তরাষ্ট্র
- দেশীয় গ্যাসের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন শেভরনের
- এলএনজি সরবরাহের পাশাপাশি টার্মিনাল পরিচালনায়ও মার্কিন প্রতিষ্ঠান
- নতুন টার্মিনাল, স্থলভাগ ও সাগরে অনুসন্ধান করতে চায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই উপস্থিতি যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশের মাটির নিচে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস খোঁজা, আমদানি করা এলএনজি দেশে আনা, ভাসমান টার্মিনাল পরিচালনা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্ত হচ্ছে একের পর এক মার্কিন প্রতিষ্ঠান।
দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনে প্রায় তিন দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার— এই তিন গ্যাসক্ষেত্র থেকে দেশের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্ধেকের বেশি সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে দেশের মোট কনডেনসেট উৎপাদনের প্রায় ৮২ শতাংশও আসে এই তিন ক্ষেত্র থেকে। হবিগঞ্জের বাহুবলে মুচাই কম্প্রেসার স্টেশনও পরিচালনা করছে শেভরন।
এবার শুধু বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রেই নয়, নতুন করে দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে অনুসন্ধানেও আগ্রহ দেখাচ্ছে মার্কিন কোম্পানিগুলো। শেভরন সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও ময়মনসিংহের একটি ব্লক এবং হবিগঞ্জের আরেকটি ব্লকের প্রায় ৬ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এর আগেও একাধিকবার এ ধরনের প্রস্তাব দিলেও সম্প্রতি সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পর্যায়ে আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর শেভরনের বেস অ্যাসেটস ও উদীয়মান দেশবিষয়ক প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার লা রোসার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে বাংলাদেশে আরও কূপ খনন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করে শেভরন। দেশের বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে এই বিনিয়োগকে স্বাগত জানায় সরকার।
শেভরনের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর সমুদ্র ব্লকেও আগ্রহ দেখিয়েছে আরেক মার্কিন জায়ান্ট এক্সনমোবিল। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে চলতি বছর সমুদ্রের ২৬টি ব্লকের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ফলে দেশের জ্বালানি অনুসন্ধানে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আগ্রহ এখন শুধু স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নেই।
গ্যাস উৎপাদনের পর আমদানি করা গ্যাস দেশে ব্যবহারযোগ্য করার অবকাঠামোতেও রয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের শক্ত অবস্থান। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি দেশীয় সামিট গ্রুপের মালিকানাধীন হলেও, দুটিরই পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর থেকে কার্যত এই প্রতিষ্ঠানই দেশের এলএনজি আমদানি অবকাঠামোর অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক।
এবার সরাসরি এলএনজি সরবরাহের ব্যবসায়ও আরও গভীরভাবে ঢুকছে এক্সিলারেট। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে করা ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ শুরু করেছে। কাতার এনার্জি থেকে এলএনজি নিয়ে তা বাংলাদেশে সরবরাহ করছে তারা।
শুধু এক্সিলারেট নয়, যুক্তরাষ্ট্রের আরেক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গানভরের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। মহেশখালীতে সামিটের ভাসমান টার্মিনালে সম্প্রতি নোঙর করা একটি বিশেষ জাহাজ ছিল এই চুক্তির প্রথম চালান। ১২ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় ১১৭টি এলএনজিবাহী জাহাজ বাংলাদেশে আসার কথা। গত ১২ আগস্ট সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই বড় ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করে।
এর বাইরে গত বছরের ২৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গেও একটি বাধ্যতামূলক নয়— এমন চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী বছরে ৫০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহের কথা রয়েছে। তবে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিটির এলএনজি ব্যবসায় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় এবং কোনো টেন্ডার ছাড়াই চুক্তি হওয়ায় এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এলএনজির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলপিজি আমদানি এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নেও আগ্রহ দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। এ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনের অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা চলছে। এলপিজি সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিকে আগ্রহপত্র জমা দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এসব কোম্পানিকে আগ্রহী করে তুলতে মার্কিন সরকারের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মার্কিন ব্যবসায়িক আগ্রহ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। সম্প্রতি ৪৭ সদস্যের একটি মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করেছে। তাদের মধ্যে ২৫টি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজেছে। একই সময়ে ৫০ সদস্যের মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্য পরিষদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।
এর পেছনে শুধু ব্যবসায়িক আগ্রহই কাজ করছে না; রয়েছে দুই দেশের বাণিজ্যিক হিসাবও। গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ছাড়ার কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি হয়। দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে করা ওই চুক্তির অংশ হিসেবে আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির শর্ত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বাড়তি আগ্রহের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ও শুল্কনীতির চাপ সামলানোর কৌশলও জড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানির আগ্রহ একেবারে নতুন নয়। এর শিকড় আরও গভীরে। ১৯৯০-এর দশকে স্কিমিটার, অক্সিডেন্টাল ও ইউনোকলের মতো মার্কিন কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছিল। সেসময় বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পর্যন্ত বাংলাদেশে এসে লবিং করেছিলেন।
বর্তমানে পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন। দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমছে, অথচ চাহিদা বাড়ছে দ্রুত। ফলে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে আর তার সঙ্গে বাড়ছে উচ্চমূল্যের এলএনজি কেনার চাপ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় আমদানির উৎসও বহুমুখী করার চেষ্টা করছে সরকার।
এই বাস্তবতায় বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানালেও দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে আসতে চাইলে তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে হবে এবং সব ধরনের চুক্তি হতে হবে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
তার মতে, পুরনো গ্যাসকূপ পুনঃখনন এবং পুরনো ক্ষেত্রগুলোর আশপাশে নতুন করে অনুসন্ধানে জোর দেওয়া জরুরি। বিদেশি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে প্রস্তুত থাকলেও চুক্তির ক্ষেত্রে দেখতে হবে কোন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
কারণ জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনো দেশের মাটির নিচেই— বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুদ কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে এবং নতুন করে কতটা গ্যাস আবিষ্কার করা সম্ভব হচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অনাগ্রহের কারণে উৎপাদন কমেছে। বিপরীতে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। ফলে একদিকে বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা তৈরি করছে নতুন ঝুঁকি।
এর মধ্যেই আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর একটি নির্মাণ করবে চীনা প্রতিষ্ঠান। তবে সেই প্রকল্পেও আগ্রহ দেখিয়েছে মার্কিন কোম্পানি। গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন ভাসমান টার্মিনাল প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। এর আগে মে মাসেও শেভরন ও এক্সিলারেট এনার্জির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি।
তবে মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী মনে করছেন, বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে অনেক বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও এই একটি বিষয়ে একমত ছিলেন। সেজন্য জ্বালানি নিরাপত্তায় তারা কাজ করেছেন। খালেদা জিয়াও নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে তাদের কাছ থেকে সেই শিক্ষাটা কেউ নেয়নি। ফলে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করতে এখন বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এর পরও যুদ্ধ, কারিগরি ত্রুটি, বৈরী আবহাওয়া— নানা কারণে বিঘ্ন হচ্ছে এলএনজি সরবরাহ।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি শুধু গ্যাসক্ষেত্রের কূপের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের মাটির নিচের গ্যাস থেকে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাব্য তেল-গ্যাস, সমুদ্রবন্দর থেকে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল— জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরেই যুক্ত হচ্ছে মার্কিন কোম্পানিগুলো।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাড়তি বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা শক্তিশালী করবে। নাকি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পিছিয়ে থেকে আমদানিনির্ভরতার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বাংলাদেশ— শেষ পর্যন্ত তার উত্তর নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত, বিনিয়োগের ধরন এবং দেশের নিজস্ব জ্বালানিসম্পদ উন্নয়নে সরকারের নীতির ওপর।



