আমি চাই, আমার কাজ দেখে মানুষ আমাকে চিনুক: নীহা চৌধুরী

নীহা চৌধুরী
মডেলিং দিয়ে পথচলা শুরু হলেও অভিনয়ের প্রতি আলাদা টান অনুভব করেন নীহা চৌধুরী। তার কাছে মডেলিং ও অভিনয় দুটিই ভালো লাগার জায়গা। তবে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ তাকে বেশি আকর্ষণ করে। প্রচলিত ইমেজের বাইরে গিয়ে ভিন্নধর্মী চরিত্রে কাজ করা, নিজের অভিনয় দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে পরিণত শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য। সম্প্রতি নিজের ক্যারিয়ার, অভিনয়ের চ্যালেঞ্জ, সামাজিক মাধ্যম এবং অভিনেতা তৌসিফ মাহবুবের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
মডেলিং থেকে অভিনয়ে আসার এই যাত্রায় নিজেকে কতটা বদলাতে হয়েছে? সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন কোথায়?
মডেলিং ও অভিনয় সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জগৎ। মডেলিং থেকে অভিনয়ে আসা মানে শুধু একটি মাধ্যম পরিবর্তন নয়; বরং নিজের নতুন একটি দিক আবিষ্কার করা। মডেলিংয়ে ক্যামেরার সামনে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হয়। কিন্তু অভিনয়ে কখনো কখনো নিজের সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব, এমনকি স্বাভাবিক সত্তাকেও আড়ালে রেখে অন্য একজন মানুষের জীবনধারণ করতে হয়।
আমার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেকে একটি নির্দিষ্ট ইমেজের মধ্যে আটকে না রাখা। আমি চাই না, মানুষ শুধু আমার বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে আমাকে বিচার করুক। আমি চাই, আমার কাজ দেখে মানুষ আমাকে চিনুক। এখনো শিখছি, নিজেকে তৈরি করছি। আমার মনে হয়, শেখার এই মানসিকতাই আমাকে সামনে এগিয়ে নেবে।
মডেলিংয়ে গ্ল্যামার বেশি চোখে পড়ে, আর অভিনয়ে জরুরি হয়ে ওঠে চরিত্র। দুই মাধ্যমের মধ্যে কোনটিতে নিজেকে বেশি স্বচ্ছন্দ মনে করেন?
দুটি মাধ্যমই আমার ভালো লাগে। তবে অভিনয়ে নিজেকে ভাঙা-গড়ার যে সুযোগ আছে, তা আমাকে বেশি টানে। মডেলিংয়ে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। অন্যদিকে, অভিনয়ে একটি চরিত্রের ভেতরে থেকে তার অনুভূতি, দুর্বলতা, রাগ ও কষ্ট প্রকাশের সুযোগ থাকে।
আমি গ্ল্যামার পছন্দ করি, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু গ্ল্যামারই যেন আমার পরিচয়ের শেষ কথা না হয়। আমি এমন জায়গায় যেতে চাই, যেখানে মানুষ আমার সৌন্দর্যের প্রশংসার পাশাপাশি অভিনয় নিয়েও কথা বলবে। আমার কাছে সেটাই হবে সত্যিকারের অর্জন।
অভিনয়ে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করতে চান কীভাবে? এমন কোনো চরিত্র আছে, যেটিতে অভিনয়ের স্বপ্ন দেখেন?
আমি চাই না, শুধু প্রচলিত নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেই আমার পরিচিতি তৈরি হোক। এমন চরিত্রে অভিনয় করতে চাই, যাদের নিজস্ব মতামত আছে, যারা ভুল করে, ভেঙে পড়ে, আবার নিজেদের মতো করে ঘুরে দাঁড়ায়। একজন নারী বাস্তবজীবনে নানা আবেগের মধ্য দিয়ে যান। আমি সেগুলো পর্দায় তুলে ধরতে চাই।
আমার স্বপ্ন, এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করা, যে বাইরে থেকে খুব শক্ত, কিন্তু ভেতরে অনেক কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে। তার গল্পে ভালোবাসা থাকবে, দ্বন্দ্ব থাকবে, হয়তো কিছু ভুল সিদ্ধান্তও থাকবে। কিন্তু সে শুধু অন্য কারও গল্পের অংশ হবে না; বরং নিজের গল্পের কেন্দ্র হয়ে উঠবে। আমি এমন চরিত্রে অভিনয় করতে চাই, যা দেখার পর দর্শক সহজে ভুলতে পারবেন না।
তৌসিফ মাহবুবের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন? সহশিল্পী হিসেবে তার কোন দিকটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে?
তৌসিফ ভাইয়ের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা খুবই ভালো ছিল। আমার কাছে একজন ভালো সহশিল্পীর সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তার সঙ্গে কাজ করার সময় যেন কোনো অস্বস্তি না থাকে এবং নিজের অভিনয় স্বাভাবিকভাবে করতে পারি। তৌসিফ ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সেই বোঝাপড়াটা পেয়েছি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন। তার সঙ্গে কাজ করতে পারাটাও আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।
তৌসিফ মাহবুবের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এমন কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা আপনার মনে দাগ কেটেছে?
একটি বিষয় আমার খুব ভালো লেগেছে। তা হলো, তৌসিফ ভাইয়ের সৃজনশীলভাবে চরিত্রকে দেখার ধরন। আমি যখন চরিত্রটি নিয়ে ভাবছিলাম, তখন আমার মাথায় সেটির একটি নির্দিষ্ট ছবি ছিল। কিন্তু তিনি যখন আমার সঙ্গে রিহার্সাল করছিলেন, তখন দেখলাম, চরিত্রটিকে তিনি একেবারেই অন্যভাবে ভাবছেন এবং দৃশ্যটিকে ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। আমি সত্যিই একটু অবাক হয়েছিলাম! তখন মনে হয়েছে, একই গল্প বা চরিত্রকে দুজন মানুষ কত ভিন্নভাবে ভাবতে পারেন। অভিনয়ের সবচেয়ে সুন্দর দিক বোধ হয় এটাই।
একজন মডেল হিসেবে ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী থাকা আর একজন অভিনেত্রী হিসেবে আবেগ প্রকাশ করা, এই দুইয়ের প্রস্তুতি কি আলাদা?
মডেলিংয়ের ক্ষেত্রে ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী থাকা এবং নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিনয়ের ক্ষেত্রে চরিত্রটিকে বুঝতে হয়, তার আবেগ অনুভব করতে হয় এবং সেই অনুভূতি স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করতে হয়। তাই দুই মাধ্যমের প্রস্তুতি কিছুটা আলাদা। তবে দুটির ক্ষেত্রেই আত্মবিশ্বাস, ক্যামেরা সম্পর্কে ধারণা এবং নিজেকে প্রকাশ করার দক্ষতা প্রয়োজন।
বর্তমান সময়ে অভিনয়শিল্পীদের কাজের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও সক্রিয় থাকতে হয়। এই বাড়তি চাপ কীভাবে সামলান?
সত্যি বলতে, এখন একজন শিল্পীর কাজ শুধু ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক মাধ্যমে মানুষ প্রতিনিয়ত আপনাকে দেখছে। আপনার কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিত্ব নিয়েও তাদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে। আমিও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়। একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে এর গুরুত্ব বুঝি।
তবে আমি মনে করি, সামাজিকমাধ্যমে দৃশ্যমান থাকাটাই একজন শিল্পীর সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। প্রতিদিন কী পোস্ট করলাম বা কত ভিউ হলো, তা নিয়ে ভাবতে থাকলে মূল কাজ থেকে মনোযোগ সরে যেতে পারে। আমি চেষ্টা করি, সামাজিক মাধ্যমকে নিজের কাজ ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখতে, নিজের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে নয়। দিন শেষে আমি চাই, আমার কাজই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সামনের দিনে নীহা চৌধুরীকে কোন পরিচয়ে বেশি দেখতে চান, মডেল, অভিনেত্রী, নাকি দুই মাধ্যমেই সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত একজন শিল্পী হিসেবে?
আমার কাছে মডেলিং ও অভিনয় দুটিই ভালো লাগার জায়গা। তবে অভিনয়ের প্রতি টানটা একটু বেশি। কারণ, অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে আরও বেশি আবিষ্কার করার সুযোগ পাই। এমন অনেক অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি, যা হয়তো নিজের জীবনে কখনো অনুভব করিনি। অন্য একজন মানুষের জায়গায় দাঁড়িয়ে তার মতো করে ভাবা এবং তার আবেগগুলো বোঝার চেষ্টা করার বিষয়গুলো আমাকে খুব টানে।
আমি জানি, অভিনয়ে নিজের একটি ভালো অবস্থান তৈরি করতে হলে আরও অনেক পরিশ্রম করতে হবে। এটি একদিনে সম্ভব নয়, আর আমি তেমন প্রত্যাশাও করি না। আমি শুধু চাই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার কাজের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও পরিণতিবোধের প্রতিফলন ঘটুক। ভবিষ্যতে যখন পেছনে ফিরে তাকাব, তখন যেন মনে হয়, সত্যিই অনেকটা পথ এগিয়েছি এবং একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজের একটি জায়গা তৈরি করতে পেরেছি।





